চল্লিশার আগেই এমন কানাঘুষা সোহানার মনটা বিষিয়ে দিচ্ছে। এক ননদ তো বলেই ফেলল, ভাই নেই তো, ওকে এখানে রেখে লাভ কী। দেবর বলল, কয়দিন দ্যাখ না, কাউকে পেলে ঠিকই কেটে পড়বে। এমন সব কথার মধ্যে নিজেকে সামলাতে না পেরেই সোহানা বলে ফেলল— স্বামীর ভিটা ছেড়ে কোথায় যাব আমি?
স্বামীর ভিটা মানে? ওটা এখন আমাদের। পোলাপান তো নাই। ভাইয়ের ভিটায় আমাদেরও হক আছে। সন্তান না থাকার বেদনা তাকে কুরে কুরে খায়। শাশুড়ির মুখে মুখে ছিল—কী বউ এনেছিস, নাতি-নাতনির মুখ দেখাতে পারল না। এমন বউ ঘরে না রাখলে কী হয়। এ বাড়িতে শুধু আদনানই ছিল তার। স্বামীর ভালোবাসায় বাড়ির অন্যদের সব অত্যাচার-নির্যাতন সয়েছিল সে।
শোক কাটিয়ে না উঠতেই এমন কথা সোহানাকে পীড়া দেয়। ওরা যেন তাড়িয়েই তবে ক্ষান্ত হবে। সোহানার মা বলে, তুই ধৈর্য ধর।
এরই মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল, সোহানা সবটাই তার নামে লিখিয়ে নিয়েছে। খবরটা এনে দিয়েছে এক উকিল। মেজো দেবরের বন্ধু। রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলের নকলকপিও সংগ্রহ করেছে। আর যায় কোথায়? উকিল বুদ্ধি দিয়েছে, পালটা মামলা করবে।
এমন পরিস্থিতিতে সোহানা বিব্রত। সে তো চায়নি আদনান তাকে লিখে দিক। তার মনে পড়ে হাসপাতালে কেবিনে, সেদিনের কথা—
বাঁশঝাড়ের ওপারে, তারা খসার দৃশ্য দেখছে আদনান। বলছে, দেখো সোহানা রাত কত হয়েছে। তারাদের আর দেখা যাচ্ছে না।
সোহানা তাকায়, সামনের দেয়ালে। জলরঙে আঁকা আকাশ ভরা তারা। বলে, কই না তো! সব ঠিক আছে। তুমি সুস্থ হয়ে উঠলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। সোহানার হাতের স্পর্শ, আদনানের মুখে। আদনান তাকিয়ে থাকে। সোহানাকে যেন অচেনা লাগতে শুরু করেছে। ভাবে—অচেনা থেকে চেনা, চেনা থেকে আবার...
সোহানার হাতে হাত রেখে আদনান বলে, না কোরো না প্লিজ। তোমাকে কিছুই দিতে পারিনি। আমি না থাকলে তুমি একা হয়ে যাবে। তার আগেই বাড়ির অংশটা তোমার নামে লিখে নাও।
স্বামীর এমন কথায় কান দেয় না সোহানা। বছর দুই আগেও এমন কথা বলেছে। তখন সুস্থ ছিল। বলেছিল—আমি মারা গেলে সম্পত্তির ভাগ পাবে ভাইবোনেরা। স্ত্রী হিসাবে তোমাকেই আমি পুরোটা দিয়ে যেতে চাই।
সম্পত্তি বলতে দেড় কাঠা জায়গা। তা নিয়ে ভাবে না সোহানা। জীবনে মা হতে না পারার দুঃখ মুছে স্বামীর সেবায় নিজেকে উত্সর্গ করেছে। সহায়সম্পত্তিতে লোভ করেনি। আজো স্বামীর কথায় গুরুত্ব দেয় না সে। বলে, আর ক’টা দিন। হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি গেলে তখন দেখা যাবে।
না, কালই আমি সব তোমাকে লিখে দিতে চাই।
এমন কথার পর আদনানের উকিল বন্ধু আখলাকুর রহমানের সাহায্যে সোহানার নামে দেড় কাঠা জমি রেজিস্ট্র্রি করে দিল। তার ইচ্ছে অনুযায়ী হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সাব-রেজিস্ট্র্রারের সামনে স্বাক্ষর করল। দু’দিন পরই পরপারে চলে যায় আদনান।
সোহানা এখন নীরবে কাঁদে।
