রপ্তানিতে মন্দাভাব

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ২০:৫৯

বাংলাদেশের অর্থনীতির দুই প্রাণভোমরা হইল গার্মেন্টস রপ্তানি ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্সের ধারায় যে সুখবর আছে, এমনটি নহে। ইহাতে উত্থান-পতন লাগিয়াই আছে। ইদানীং বিদেশ হইতে অনেক শ্রমিক ফেরত আসিবার খবরও পাওয়া যাইতেছে। অন্যদিকে গার্মেন্টস রপ্তানি কমিয়া যাইবার কারণে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয়েও ভাটা দেখা যাইতেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী চার মাসের মধ্যে গত তিন মাস ধরিয়া টানা রপ্তানি কমিতেছে। ইহার মধ্যে সদ্য সমাপ্ত অক্টোবরে রপ্তানি কমিয়াছে ১৭ শতাংশ। চলতি অর্থবত্সরের প্রথম চার মাসে আগের অর্থবত্সরের তুলনায় রপ্তানি কমিয়াছে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। গত অর্থবত্সরের (২০১৮-১৯) এই সময়ে রপ্তানি হইয়াছিল ১ হাজার ৩৬৫ কোটি ডলার। বর্তমান ২০১৯-২০ অর্থবত্সরে তাহা কমিয়া দাঁড়াইয়াছে ১ হাজার ৭২ কোটি ডলার। অর্থাত্ রপ্তানি কমিয়াছে প্রায় ৯৩ কোটি ডলার যাহা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় পৌনে ৮ হাজার কোটি টাকা। ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাসে রপ্তানি কমিয়া যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের মধ্যে দেখা দিয়াছে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা।

আমাদের পণ্য রপ্তানির ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত হইতে। ফলে এই খাতের রপ্তানি কমিয়া গেলে রপ্তানি আয়ে সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। ইহা ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি আয় হ্রাস-বৃদ্ধির উপরও তাহার প্রভাব পড়িয়া থাকে। গত চার মাসে রপ্তানি আয় কমিয়া যাইবার বড়ো অনুঘটক হইল তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি হ্রাস। গার্মেন্টস শিল্পমালিকরা বলিতেছেন, অনেক মালিকেরই সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই অব্যবহূত থাকিয়া যাইতেছে। প্রথমত বাংলাদেশ হইতে কিছু ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হইয়া মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে চলিয়া যাইতেছে। দ্বিতীয়ত প্রতিযোগী দেশগুলির স্থানীয় মুদ্রা ডলারের বিপরীতে দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে। ইহাতে তাহারা আমাদের চাইতে প্রতিযোগিতামূলক দরে অর্ডার নিতে পারিতেছে। তৃতীয়ত বিশ্বব্যাপী মন্দাভাব বিরাজ করায় পোশাকের দরও এখন কমতির দিকে।

অবশ্য একসময়ের আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ রপ্তানি বাণিজ্যে সাম্প্রতিক কালে সাফল্যেরই পরিচয় দিয়াছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবত্সরে ২০২টি দেশে ৭৫০টি পণ্য ও সেবা রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ মোট আয় করিয়াছে ৪৬.৮৮ বিলিয়ন ডলার। আগের বত্সরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হইয়াছে ১৪.৩০ শতাংশ। এই কারণে ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিক্যাল রিভিউ  বলিয়াছে,  ২০১৯ অনুযায়ী রপ্তানি প্রবৃদ্ধির দিক হইতে বিশ্বে শীর্ষদেশ ভিয়েতনামের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। তাহার পরও চলতি অর্থবত্সরে যে ৬০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হইয়াছে, তাহা কতটা অর্জিত হইবে তাহা লইয়া দেখা দিয়াছে সংশয়। যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি স্থগিত করিবার পরও আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে এক ধরনের ধাক্কা লাগিয়াছে। যদি আমরা কাটাইয়া উঠিতে পারি, তাহা হইলে বত্সর শেষে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা যাইবে বলিয়া আমরা মনে করি। এইজন্য রপ্তানিতে ডলারের আলাদা মূল্য নির্ধারণসহ সরকারের নীতি-সহায়তা শুধু চাহিলেই হইবে না, রপ্তানির তালিকায় নূতন নূতন পণ্যও সংযোজন করিতে হইবে। পণ্যের চাহিদা মোতাবেক অনুসন্ধান করিতে হইবে নূতন নূতন বাজার । ইহা ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, সুদের হার হ্রাসসহ ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলি গড়িয়া তুলিতে মনোনিবেশ বৃদ্ধি ও মানসম্মত পণ্য উত্পাদনের মাধ্যমে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাইতে পারি।