এখন বড়ো মাপের মানুষ খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। বড়ো মাপ বলতে আমরা কী বুঝি, সেটাই পরিষ্কার নয়। সমাজে মুখে মুখে কিছু কথা প্রচলিত আছে। সবাই তাদের সন্তানদের বলেন, মানুষের মতো মানুষ হও। কিন্তু এই মানুষের মতো মানুষ কারা? কাদের তারা মানুষের মতো মানুষ মানবে? এর কি কোনো জ্ঞান বা সীমানা দেওয়া আছে? না তারা জানে? আমি বলি, যে জাতি একত্রে রবীন্দ্রনাথ নজরুল বঙ্গবন্ধুকে মানে না, তারা কী করে বড়ো মাপের মানুষ খুঁজে পাবে? তারপরও আমাদের দেশে কত বড়ো মানুষ জন্মেছেন। আমরা কি আসলেই তাদের খবর রাখি? ৯২ বছর পূর্বে চট্টগ্রামের গহিরায়, যা কিনা রাউজান উপজেলায়, সেখানে একজন বড়ো মানুষ জন্মেছিলেন। কিন্তু আমরা সেখানে জন্ম নেওয়া জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কান্ডারি কবি মানুষটিকে তেমন চিনি না। যেমন চিনি না সেখানকার বিদ্যানুরাগী কৃতী পুরুষ শহিদ নূতন চন্দ্র সিংহকে। কিন্তু এই জাতি ঠিকই সেখানকার কুখ্যাত লোকদের চেনে। কারণ নেগেটিভ ও রুচিহীন বিষয়েই আমাদের আগ্রহ অধিক। আমরা যত কথা বলি না কেন, সমাজ এমন এক নোংরা জায়গায় চলে এসেছে এখানে নেগেটিভ মানুষ আর রুচিহীনতার জয়জয়কার। বলা উচিত, ভিলেনের কাছে পরাজিত যত নায়ক।
এই ভদ্রলোক ১৯৪৭ সালে গহিরা হাইস্কুল থেকে বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর কলেজ পরিদর্শনে এসে ছাত্রদের উদ্দেশে বক্তৃতা প্রদানকালে আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করলে মাহবুব উল আলম চৌধুরী প্রতিবাদে সোচ্চার হন এবং শেষ পর্যন্ত লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখেই কলেজ ছাড়তে বাধ্য হন। এখন কি তা ভাবাও সম্ভব? অথচ আমরাই বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া জাতি। হিন্দিসহ বিদেশি ভাষার আগ্রাসনে আজ আবার বাংলার নাভিশ্বাস। তার পরও আমরা এই ভদ্রলোকের মতো সাহস নিয়ে দাঁড়াতে পারছি না।
১৯৪৭ সালে তিনি চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং এ সংগঠনের কর্মী হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে অংশ নেন। এ বছরেরই নভেম্বর মাসে তার সম্পাদনায় সীমান্ত নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি ১৯৫২ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ছাপা হতো এবং দুই বাংলার প্রগতিশীল লেখকরা এতে লিখতেন। সীমান্ত পত্রিকা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। গান, নাচ, নাটক, আবৃত্তি সবখানেই ছিলেন উদ্যোক্তা ও সংগঠক। তিনি গান লিখে গেয়েছেনও। তিনি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। চট্টগ্রামের প্রান্তিক নব নাট্যসংঘ ও কৃষ্টি কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক সীমান্ত (১৯৪৭-৫২) ও দৈনিক স্বাধীনতা (১৯৭২-৮২) পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
আমার সৌভাগ্য আমি তার সম্পাদিত স্বাধীনতা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। সেই বয়সেও তারা আমার শেষ বিকেলের রোদ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস ছেপেছিলেন। এই মানুষটি দেশ ও ভাষাকে কেমন ভালোবাসতেন সে কাহিনি ইতিহাসে লেখা থাকলেও আমরা অনেকেই জানি না। ঘটনা বলছে : বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে চট্টগ্রামে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তিনি এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন চৌধুরী হারুনুর রশীদ ও এম এ আজিজ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হরতাল পালিত হয়। ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের খবর আসে চট্টগ্রামে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সাংবাদিক-সাহিত্যিক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের কাছে। তখন জর ও জলবসন্তে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। শ্রমিকনেতা চৌধুরী হারুনুর রশীদ ও আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা এম এ আজিজ তাই আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করছিলেন। গুলিবর্ষণের খবরটা শোনার পর তিনি রচনা করেন ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ নামের কবিতা। অসুস্থতার কারণে তার হাতে লেখার ক্ষমতা ছিল না তখন। তিনি বলে যাচ্ছিলেন, কবিতার পঙিক্তগুলো আর সহকর্মী ননী ধর তা লিখে নিলেন। এটি হলো একুশের প্রথম কবিতা। আন্দরকিল্লায় কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসে কবিতাটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশের দায়িত্ব নিলেন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। উদ্দেশ্য ছিল সারা রাত প্রেসে কাজ করে পরদিন সকালে গোপনে পুস্তিকাটি প্রকাশ করা। এক ফর্মার এই পুস্তিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছিল শিরোনাম ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ এবং নিচে কবির নাম। প্রকাশক হিসেবে নাম ছিল কামালউদ্দিন খানের এবং মুদ্রাকর হিসেবে প্রেসের ম্যানেজার দবিরউদ্দিন আহমদের। শীতের রাতে যখন কম্পোজ ও প্রুফের কাজ প্রায় শেষের দিকে, তখন পুলিশ সুপার আলমগীর কবীরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ প্রেসে হানা দেয়। প্রেসে উপস্থিত কর্মচারীদের বুদ্ধিতে লুকিয়ে যান খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস এবং রক্ষা পায় সম্পূর্ণ কম্পোজ ম্যাটার। পুলিশ তন্ন তন্ন করে খোঁজ করেও কিছুই পেল না। কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসের কর্মচারীরা গোপনে পুস্তিকাটির প্রায় ১৫ হাজার কপি বিক্রয় ও বিতরণের জন্য মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ শেষ করেন। ঢাকায় গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২৩ ফেব্রুয়ারি সমগ্র চট্টগ্রামে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। লালদীঘি ময়দানে বেলা ৩টায় অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় প্রতিবাদ সভার জনসমুদ্রে ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন চৌধুরী হারুনুর রশীদ। কবিতা শুনে বিক্ষুব্ধ জনতা স্লোগান দেয়, ‘চল চল ঢাকা চল’, ‘খুনি লীগশাহীর পতন চাই’, ‘লীগ নেতাদের ফাঁসি চাই, নুরুল আমিনের কল্লা চাই’। এর কয়েক দিন পরেই সেই সময়কার মুসলিম লীগ সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ করে।
এত ঘটনা এত কাহিনি, তবু তিনি থেকে গেলেন অন্ধকারে। পুরোটা বলা যাবে না যদিও। কিন্তু আমাদের দেশে সবকিছু এককেন্দ্রিক। এখনো সব রাজধানীনির্ভর। এবার দেশে গিয়ে ঢাকায় না যাওয়া পর্যন্ত মনে হচ্ছিল চট্টগ্রামে এসেছি। যখন ঢাকায় গেলাম, দু-একটা জাতীয় মিডিয়ায় ছবিসহ কথা বলার সুযোগ পেলাম, তখনই মনে হলো বাংলাদেশে এসেছি। এই বাস্তবতা তখন ছিল আরো প্রকট। তাই যদি না হবে, যিনি ভাষা আন্দোলনের পর প্রথম কবিতা লিখলেন, লিখে ইতিহাস হলেন, তিনি কেন একুশে পদক পেলেন মারা যাওয়ার পর? কেন ২০০৯ সালে তিনি মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন? এর উত্তর আমাদের জানা নেই। আমরা নিয়তিতে বিশ্বাসী জাতি। তাই এসব নিয়তি বলে মেনে নিই। আর সেই সঙ্গে আমাদের মেরুদণ্ড ক্রমে নুইয়ে পড়ে। পড়তে পড়তে এখন যা ভঙ্গুর।
নতুন প্রজন্মকে জানানো, তারুণ্যকে জানানো যাদের দায়, তারা খুব ব্যস্ত। ব্যস্ত সমাজ, ব্যস্ত জীবন। বড়ো মানুষের কাজগুলো ছোটো হতে হতে একসময় যদি হারিয়ে যায়, তবে কষ্টের সীমা থাকবে না। এই মানুষটি সাহসী, প্রজ্ঞাবান আর মেধায় ভরপুর এক মানুষ। ইতিহাস তাকে মনে রাখবে। এই মাটিতে যতদিন একজন মানুষ মাতৃভাষায় কথা বলবে, যতদিন নদীগুলো মায়ের মতো প্রবাহিত হবে, যতদিন বাংলা নামের ফুলগুলো ফুটবে, যতকাল বাংলায় বাংলাদেশের পাখিরা গান গাইবে, ততদিন জানবে ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতা লিখে প্রথম বাংলা মাকে কাঁদিয়েছিলেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী। চট্টগ্রাম তথা দেশের, তথা বাঙালির কৃতী সন্তানের জন্মদিন ৭ নভেম্বর।
শুভ জন্মদিন প্রিয় অগ্রজ অভিভাবক মাহবুব উল আলম চৌধুরী।
n লেখক: সিডনী প্রবাসী

