হাতে-কলমে শিক্ষার অপর নাম স্কাউটিং

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ২১:০২

মো. জাহানুর ইসলাম

সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষা খুবই কার্যকরী এটি শুধু কথার কথা না, আজ এটাই চরম বাস্তব। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা আর যা-ই করুক, দেশের জন্য কখনো বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না।  প্রশ্ন হচ্ছে, কারিগরি শিক্ষা দ্বারা আসলে কী বোঝায়? এর উত্তরে দুই-চার জন বাদে হয়তো অধিকাংশই বললেন, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কিংবা বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যা পড়ানো হয়, তা-ই কারিগরি শিক্ষা। খোলা চোখে এটা সত্য হলেও বৃহত্ পরিসরে কারিগরি শিক্ষা শুধু এই প্রতিষ্ঠানগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। কারিগরি শিক্ষা হলো হাতে-কলমে বাস্তবধর্মী শিক্ষা, যেখানে পাশ-ফেল বলে কিছু নেই। কারিগরি শিক্ষায় তত্ত্বীয় পড়াশোনার চেয়ে বাস্তব প্রয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে করে একজন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে ভালো কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারে। বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় কারিগরি শিক্ষাকে চাকরির ক্ষেত্রেও খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। একজন চাইলে খুব সহজেই কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের আগের কাজ থেকে বেরিয়ে নতুন কাজ করতে পারে এবং নিজের ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কারিগরি শিক্ষা এক জন মানুষকে যোগ্য প্রতিযোগী করে গড়ে তোলার এক বৃহত্ প্রয়াস, যেখানে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি হাতে-কলমে শিক্ষাকেও সমানভাবে মূল্যায়ন করা হয়। কারিগরি শিক্ষায় পরিপূর্ণ দক্ষতা অর্জনের জন্য এবং একজন যোগ্য প্রতিযোগী হতে আপনাকে যতবার প্রয়োজন ততবার পরীক্ষা দেওয়ার এবং নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তাত্ত্বিক জ্ঞান থেকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষিত জ্ঞানই বেশি সমাদৃত। তাই কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বও বেশি।

স্কাউটিং বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় একটি শিক্ষামূলক যুব আন্দোলন, যা যুবাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি দেশের চার কোটিরও বেশি শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী স্কাউটিংয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের এগিয়ে নিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশেও রয়েছে প্রায় ১৭ লাখ কাব স্কাউট, স্কাউট ও রোভার স্কাউট। স্কাউট আন্দোলনের প্রবর্তক লর্ড ব্যাডেন পাওয়েলের বিশ্বখ্যাত বাণী ‘পৃথিবীটাকে যেমন পেয়েছ তার চেয়ে একটু সুন্দর করে রেখে যেতে চেষ্টা কর’। স্কাউটিংয়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিশু, কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক গুণাবলী উন্নয়নের মাধ্যমে তাদেরকে পরিবার, সমাজ দেশ তথা বিশ্বের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। স্কাউটিংয়ে শেখানো হয় কিভাবে প্রতিকূল অবস্থা জয় করতে হয়। আয়োজন করা হয় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অফিস ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকতা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নার্সিং, ব্লাড গ্রুপিং, বনায়ন,  কম্পিউটার শিক্ষাসহ বিবিধ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ প্রশিক্ষণের। ফলে স্কাউট ও রোভাররা সাধারণ বিভাগের শিক্ষার্থী হয়েও কারিগরি শিক্ষা লাভ করে নিজেকে আরো বেশি করে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পায়। এতে করে তারা যেমন ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হয়, তেমনি দেশের উন্নয়নেও অবদান রাখে। এদিক থেকে এ কথা বলা যায়, কারিগরি শিক্ষা ও স্কাউটিং শিক্ষার মধ্যে খুবই সাদৃশ্য রয়েছে। সমাজ পরিবর্তনে কারিগরি শিক্ষার মতো স্কাউটিংও খুবই গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করি। এক্ষেত্রে এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়, স্কাউটিং কারিগরি শিক্ষার চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্কাউটিং যে শুধু কারিগরি শিক্ষা তা কিন্তু নয় পাশাপাশি  মানবিক সমাজ গঠনেও অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করছে। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, আপত্কালীন উদ্ধার, নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের ভিটামিন এ+ ক্যাপসুল খাওয়ানো, নবজাতকদের ইপিআই টিকা প্রদান, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণসহ সমাজের বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে স্কাউটরা।

গত বছর বাংলাদেশ  স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছে। তবে চূড়ান্তভাবে এই যোগ্যতা অর্জন করতে আরও পাঁচ বছর উন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এরপর ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি মিলবে। এই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে অন্যান্যদের পাশাপাশি স্কাউট ও রোভাররা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে মনে করি। কেননা স্কাউটরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষিত। তাই স্কাউটিং সম্প্রসারণে সরকারের পাশাপাশি সবার এগিয়ে আসা উচিত।

n লেখক :শিক্ষার্থী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়