শিল্পায়নে যাব, কিন্তু কৃষি ত্যাগ করে নয় :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৫১

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বর্তমান সরকার কৃষি ও কৃষকদের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েই উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। আমরা উন্নত হব, শিল্পায়নে যাব। কিন্তু কৃষি ও কৃষককে ত্যাগ করে নয়। কারণ কৃষিই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। খাদ্য দেয়, পুষ্টি দেয়, সবকিছু করে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ কৃষক লীগের দশম সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, একটি দেশের জন্য একটি সমাজের জন্য কৃষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখনো অনেকাংশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষি জমি নষ্ট করে কোনো স্থাপনা শিল্প-কারখানা করা যাবে না।     উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। এতে কাউন্সিলররা আলোচনার মাধ্যমে কৃষক লীগের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করেন। সংগঠনের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সমীর চন্দ্র চন্দ, সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন উম্মে কুলসুম স্মৃতি। দুজনই আগের কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করে বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া আগামী সাত দিনের মধ্যে নেত্রীর কাছে জমা দেবেন। ’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর অনেকের কৃষিকাজ করতে না চাওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে বলেন, অনেকে লেখাপড়া শিখলেই আর মাঠে যেতে চায় না। কৃষকের ছেলে, বাবা কৃষি কাজ করে লেখাপড়া শিখিয়েছে। তার ছেলেমেয়ের অবশ্যই মাঠে যাওয়া উচিত। নিজের কাজ নিজে করায় লজ্জার কিছু থাকে না। এ বিষয়ে কৃষক লীগের একটা ভূমিকা থাকা দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের স্কুলজীবন থেকে এটা অভ্যাস করা দরকার।’ কৃষি সংক্রান্ত কোনো কাজে গ্রামের মানুষকে তাকে ডাকতে বলে রেখেছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ১৮ জন কৃষককে গুলি করে হত্যার ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখনই সরকারে এসেছে সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রথম কেবিনেট মিটিংয়ে সারের দাম কমিয়ে দিলাম। প্রায় চার দফা আমরা কমিয়েছি। আমরা ভর্তুকি দিচ্ছি।’ কৃষিতে ভর্তুকির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকসহ বিদেশি দাতা সংস্থার বাধা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তাদের বলেছি, আপনাদের টাকা লাগবে না, নিজের টাকা কৃষিতে ভর্তুকি দিব।

কৃষকের ন্যায্যমূল্যে উন্নতমানের বীজ পাওয়া নিশ্চিতে জাতির পিতা প্রতিষ্ঠিত বিএডিসি লাভজনক না বলে বন্ধ করে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সব সময় সব কিছুতে লাভ লোকসান দেখলে চলে না। আমার দেশের মানুষ কতটুকু উপকার পাবে সেটাই আমাদের চিন্তার বিষয় হতে হবে।’ যত্রতত্র শিল্প-কারখানা স্থাপন না করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ১০০টা অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি। এটার অর্থ হলো কোনো কৃষিজমি যেন নষ্ট না হয়। যেখানে সেখানে যত্রতত্র একটা ইন্ডাস্ট্রি এটা কেউ করতে পারবে না।’

রপ্তানিতে কৃষি পণ্যের প্রাধান্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনার পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রতিটি মানুষের কাছে বিদ্যুত্ সেবা পৌঁছে দিতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধান কাটা, ধানের চারা রোপণ করা, জমি চাষ-কৃষির সবকিছুকে যান্ত্রিকীকরণ করতে চাই। তবে তা অবশ্যই কৃষিজমি রক্ষা করে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করায় এখন পুষ্টির দিকে নজর দিয়েছি। ডিম, মাংস, মিঠা পানির মাছ, তরিতরকারি এবং ধান উত্পাদনে তার সরকারের সাফল্যও এ সময় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার সরকারের ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ কর্মসূচির উল্লেখ করে যার যার বাড়িকে তার তার খামারে পরিণত করার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কেউ বসে থাকবে কেন, সবাই কাজ করবে। যে যেভাবে উত্পাদন করতে চায়, যা উত্পাদন করতে চায়। আমরা সেই সুযোগটা দেব এক টুকরো জমিও অনাবাদী থাকবে না।’ এ সময় তার সরকারের পল্লি সঞ্চয় ব্যাংক করে দেওয়ায় তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী উত্পাদিত পণ্য সমবায়ের মাধ্যমে বাজারজাতকরণের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।

এর আগে বেলা ১১টা ১০ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সম্মেলনস্থলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। পরে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা এবং কৃষক লীগের দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। পরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। সম্মেলনস্থলে দেশাত্মবোধক ও কৃষক লীগের দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এছাড়া সংগঠনের সাময়িকী ‘কৃষকের কণ্ঠ’- এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। এছাড়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, চার জাতীয় নেতা, স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সকল গণআন্দোলনের শহিদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার সামসুল হক রেজা, সর্বভারতীয় কিষান সভার সাধারণ সম্পাদক অতুল কুমার অঞ্জন উপস্থিত ছিলেন।