বিশ্ব বাস্তবতায় কৃষির বর্তমান ও ভবিষ্যত্ চিত্র

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১:২৮

সারা বিশ্বে কৃষি উত্পাদন বাড়াতে প্রতিনিয়ত বহু ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ আগামী বিশ্বের ১০ বিলিয়ন জনসংখ্যার জন্য খাদ্য নিশ্চয়তা সুসংহত করতে হলে ২০১০ সালে যে খাদ্য ক্যালরি উত্পাদিত হয়েছে, তা কমপক্ষে ৫৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। এ জন্য বাড়তি জমির প্রয়োজন পড়বে ৬৯ কোটি ৩০ লাখ হেক্টর (যা দুটি ভারতের সমান) আর বৈশ্বিক তাপমাত্রা সহনীয় মাত্রায় রাখতে প্রত্যাশিত গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনকে আয়ত্তের মধ্যে রাখতে হবে। সম্প্রতি ভার্জিনিয়া টেক কলেজ অব এগ্রিকালচার অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস কর্তৃক বৈশ্বিক কৃষি উত্পাদনশীলতা প্রতিবেদন বা গ্লোবাল এগ্রিকালচার প্রোডাক্টিভিটির (গ্যাপ) একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০ বিলিয়ন জনসংখ্যার জন্য খাদ্য, আঁশ, পশুখাদ্য ও বায়োএনার্জির চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের কৃষির উত্পাদনশীলতা, যেটাকে মোট গুণক উত্পাদনশীলতাও (Total Factor Productivity) বলা হয়, তা বাড়াতে হবে।

কৃষির উত্পাদনশীলতা তখনই বাড়ে, যখন কৃষক প্রযুক্তি ও দক্ষ উত্পাদন ব্যবস্থাপনার ব্যবহার করে বিদ্যমান বা কম সম্পদ থেকে অধিক শস্য ও পশুসম্পদ উত্পাদন করে। নীতিনির্ধারকদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা গ্রহণে কৃষির উত্পাদনশীলতার বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক এই উত্পাদনশীলতার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ১.৭৩ শতাংশ হতে হবে, যা এখন ১.৬৩ শতাংশ। চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বেশ কয়েক বছর ধরে যেমন শক্তিশালী উত্পাদনশীলতা প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তেমনি লাতিন আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৈশ্বিক খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য এটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। ওয়ার্ল্ড রিসোর্চ ইনস্টিটিউট ২০৫০ সালে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের প্রবৃদ্ধি, অরণ্যবিনাশ ও বর্ধিত দারিদ্র্য ছাড়াই সবার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে খাদ্য উত্পাদনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য পাঁচটি পন্থার তালিকা দিয়েছে। তাদের মতে, খাদ্য ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উত্পাদন চাহিদার হার কমাতে হবে, যা অর্জন করা যেতে পারে খাদ্যের অপচয় রোধ করে, খাদ্যাভ্যাস পুষ্টিকর ও টেকসই খাদ্যে পরিবর্তন, বায়োএনার্জি, খাদ্য, ভূমির মধ্যে প্রতিযোগিতা পরিত্যাগ, প্রতিস্থাপন স্তর উর্বরতার (replacement level fertility) হার অর্জনের মাধ্যমে। তেমনিভাবে কৃষিজমির পরিমাণ না বাড়িয়েই খাদ্যের উত্পাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে, যা অর্জন করা যেতে পারে পশুসম্পদ ও তৃণক্ষেত্রের উত্পাদনশীলতা বাড়িয়ে।

সবচেয়ে আশার কথা হলো, বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন কৃষি উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, বাংলাদেশের কৃষি তখন এগিয়ে চলছে এক অনন্য গতিশীলতার সঙ্গে। ১৯৫৫ সাল থেকে বাংলাদেশের গড়পড়তা কৃষি উত্পাদনশীলতা প্রবৃদ্ধি ২.৭ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের স্থান।  বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষি মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। দেশের ৭০ শতাংশ জনসংখ্যার বসতি গ্রামে। দুই-তৃতীয়াংশ গ্রামীণ জনসংখ্যার কর্মসংস্থান সরাসরি কৃষির মাধ্যমেই হয়ে থাকে আর ৮৭ শতাংশ গ্রামীণ বসতির আয়ের কমপক্ষে অংশবিশেষ কৃষির মাধ্যমে আসে। সুতরাং নিশ্চিত করেই বলা যায় কৃষি ও গ্রামীণ জনসংখ্যার উন্নয়ন বাদ দিয়ে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের চিন্তা বাতুলতা মাত্র। তাই কৃষির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

আমাদের কৃষকেরা তাদের উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিয়ে হরহামেশাই বিপাকে পড়ছেন, মাঠে ফসল উত্পাদনে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীনও হতে হচ্ছে। তাছাড়া ভবিষ্যত্ কৃষির রূপরেখাও এখনো অজানা। কৃষির উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য তত্ত্বগত অনেক পদক্ষেপের কথা বলা হলেও এগুলো সব দেশের সার্বিক অবস্থা বা সব অবকাঠামোতে প্রযোজ্য নয়। তাই আমাদের দেশের কৃষির জন্য চ্যালেঞ্জগুলোকে শনাক্ত করতে হবে, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সক্রিয় হতে হবে। ফসল উত্পাদনের জন্য মাটির স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষির বহুমুখীকরণ, বালাই ব্যবস্থাপনার মতো অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তনের যে প্রভাব বাংলাদেশে পড়েছে, তা দেশের কৃষি উত্পাদনশীলতার গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণ ও রপ্তানি উন্নয়ন যে গতিতে চলছে, তা দেশের কৃষি উত্পাদনশীলতাকে কত দিন প্রবৃদ্ধির পথে রাখবে, তা এখন এক বড়ো প্রশ্ন। তাছাড়া বিদ্যমান খাদ্যাভ্যাসে আমাদের পুষ্টির চাহিদা ও জোগান বিশ্লেষণ  করে কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থাকে সাজানোর প্রয়োজনও রয়েছে।

n লেখক :প্রবাসী কৃষি বিজ্ঞানী