গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১:২৮

শিশুদের জন্য যেসব আনন্দ-উপকরণ বা খেলার সামগ্রী রয়েছে, সেসবের মধ্যে বেলুন অন্যতম প্রধান একটি। রাজধানী বা অন্যান্য বড়ো শহরের রাস্তায়, ফুটপাতে প্রচুর বেলুন বিক্রি হয়। দোকানেও বেলুন পাওয়া যায়, সেসব ফুলিয়ে নিতে হয়; সাধারণত মুখে ফোলানো হয়। খেলার কাজ চললেও সমস্যা হলো এগুলো ভাসমান থাকে না। তাই রাস্তায়-ফুটপাতে যেসব বেলুন পাওয়া যায়, সেগুলো শিশুদের বেশি পছন্দ। সেগুলো গ্যাসে ফোলানো হয়। ব্যবহূত গ্যাস বাতাসের চেয়ে হালকা বলে এগুলো ভাসমান থাকে এবং ঊর্ধ্বগতিসম্পন্ন হয়। এগুলোকে ধরে রাখার জন্য সুতা বেঁধে রাখা হয়। এসব বেলুনে ব্যবহার্য গ্যাস (সাধারণত হাইড্রোজেন) নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যে সিলিন্ডারে গ্যাস রাখা হয়, সেটির বিস্ফোরণের ঝুঁকিও বেশ প্রবল। কখনো সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। ঢাকার মিরপুরের রূপনগরে সম্প্রতি বেলুনে গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় মারা গেছে ৮ জন। আরো অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে কারো কারো অবস্থা আশঙ্কাজনক।

সিলিন্ডারে হাইড্রোজেন ভরে বেলুন ফোলানোর প্রক্রিয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় উন্নত দেশগুলোতে ২০০ বছর আগেই তা নিষিদ্ধ হয়েছে। সেখানে বেলুন ফোলানোর জন্য নিরাপদ হিলিয়াম গ্যাসের প্রচলন রয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশেই বেলুন বিক্রেতারা বিপজ্জনক সিলিন্ডার গ্যাস দিয়ে বেলুন বিক্রি করছে। নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর বিপজ্জনক হয়ে ওঠে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো। একেকটি মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার একেকটি শক্তিশালী বোমা!

অপচয় রোধ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না। তবে সিলিন্ডার ব্যবহারের চেয়ে এর নিরাপত্তা ও ব্যবহারিক সহজলভ্যতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মানহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে দেশের লাখ লাখ বাড়ি এবং রাস্তার গাড়ি টাইমবোমার মতো বিস্ফোরণের ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে। সিএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাসের বোতলজাত ব্যবহার সারা বিশ্বেই বাড়ছে। তবে বিশ্বের আর কোথাও এমন যথেচ্ছ, নিরাপত্তাহীন গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার আছে কি না আমাদের জানা নেই। সিলিন্ডারের যথাযথ মান, উত্পাদনের পর নিরাপদ মেয়াদ ও গ্যাসের যথাযথ পরিমাপ ও মূল্য কোনোটাই যথার্থভাবে রক্ষিত হয় না। এ কারণে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অনুমোদনহীনভাবে মানহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিরাপত্তাহীন সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বিক্রি করছে। এ কারণেই যত্রতত্র ঘটছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। সামপ্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন রোগীদের বেশিরভাগই রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের শিকার। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিশ্চিত করা জরুরি।

বেলুন ফোলানোর কাজে যে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর অধিকাংশই পুরনো সিলিন্ডার কেটে বানানো। যার ফলে এগুলোর বিস্ফোরণ বেশি হয়। বেলুন ফোলানো গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে যেখানে-সেখানে যেন বেলুন ফোলানো না হয়, সেদিকটিও নিশ্চিত করতে হবে। সেইসঙ্গে বাসাবাড়ি এবং গাড়িতে ব্যবহূত সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে। সিলিন্ডার কেনার আগে দেখতে হবে নিরাপত্তা সিল। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করাতে হবে। জনস্বার্থে সরকারের নির্ধারিত সংস্থাকেও উদ্যোগী হতে হবে। বাড়াতে হবে কঠোর নজরদারি। এর সঙ্গে জরুরি জনসচেতনতা, এর বিকল্প নেই।

একটি সিলিন্ডারের আয়ুকাল ১৫ বছর হলেও প্রতি পাঁচ বছর পরপর সিলিন্ডারটি পুনঃপরীক্ষণ জরুরি। সিলিন্ডার রিটেস্টের নিয়ম রয়েছে, কিন্তু তা যথাযথভাবে মানা হয় না। আর নিয়ম মানা হয় না বলেই সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মানুষ মারা যাচ্ছে। সিলিন্ডারের ভেতরে প্রবল চাপে গ্যাস প্রবেশ করানো হয়। ফলে কোনো কারণে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটলে তার ভয়াবহতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। যার সর্বশেষ মর্মান্তিক উদাহরণ প্রত্যক্ষ করতে হলো রাজধানীর মিরপুরে। এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন প্রতিরোধ ব্যবস্থা। নিয়মিত সিলিন্ডার রিটেস্ট করানো, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নিম্নমানের সিলিন্ডার ও রেগুলেটর ব্যবহার না করার মাধ্যমে এ ধরনের দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে জরুরি আমাদের নিজেদের সচেতনতা।

নারায়ণগঞ্জ