দশ দিগন্তে

আমাদের পুলিশের ‘নিউ ইমেজ’ যেন নষ্ট না হয়

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ২২:২২

নারায়ণগঞ্জের এসপি বিশাল দুর্নীতির অভিযোগে তার পদ থেকে অপসারিত হয়েছেন। চাকরিচ্যুত হননি। তাকে দেওয়া ফেয়ারওয়েলে তাকে কাঁদতে দেখলাম। বিদায় সম্ভাষণে বারবার চোখ মুছছিলেন। বারবার বলছিলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।’ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যে দুর্নীতিপরায়ণ হতে পারে না বা হয়নি তার প্রমাণ নেই। তাই তার এই দাবি আমার মনে দাগ কাটেনি। দাগ কেটেছে তার কান্না। 

এসপি হারুন নামটি আমার কাছে খুবই পরিচিত। বিএনপির এক নেতাকে একসময় পিটিয়ে তিনি পরিচিতি লাভ করেছিলেন। নারায়ণগঞ্জে তার পোস্টিং হওয়ার পর সেখানকার বহু বন্ধুবান্ধবের কাছে তার প্রশংসা শুনেছিলাম। তারা বলেছিলেন, এসপি হারুন এমনই দুর্দান্ত সাহসী যে, নারায়ণগঞ্জে তিনি বাঘে-গোরুকে এক ঘাটে পানি খাওয়াচ্ছেন। শহরের যেসব ‘খান্দানি রাজনৈতিক অভিভাবক’ সন্ত্রাস ও দুর্নীতির গডফাদার, তারা পর্যন্ত তার ভয়ে থরহরি কম্পমান। তার প্রশংসা শুনে শুনে ভাবছিলাম, তিনি বাংলাদেশে বাগদাদের খলিফা হারুন-অর-রশিদ হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন।

তারপর সহসা তার এই হিমালয়ান পতন, ফেসবুকের সব খবর আমি সব সময় বিশ্বাস করি না। তবে এসপি হারুনের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে অভিযোগ যদি সিকিভাগও সত্য হয়, তাহলে বলতে হবে পুলিশ ঘুষখোর বলে সর্বত্র যে ধারণা দীর্ঘকাল ধরে লোকে পোষণ করে, তা পালটাবার সময় সম্ভবত এখনো আসেনি।

এসপি হারুন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি ছবি ও খবর দেখে বিস্মিত হয়েছি। এটিও এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসার সম্পর্কে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পুলিশ অফিসার তার গাড়িতে ঘুমিয়ে আছেন। তার পাশেই টাকার পাহাড়। নিশ্চয়ই এই পুলিশ অফিসারও এখন বিপাকে পড়েছেন। 

ঢাকার এক সাংবাদিক বন্ধু জানালেন, ফেসবুকের এই ছবি ও খবরের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ আছে। ঢাকার কোনো কাগজেই এই খবরটি নেই। খবরটির সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও এই ছবি ও খবর দেখে প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনের জীবিতাবস্থায় তার সম্পর্কে এই ধরনের একটি খবরের কথা মনে পড়েছে। তার এক পিএস বা এপিএসের গাড়িতেও কয়েক লাখ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। এই ঘটনায় তাকে রেলমন্ত্রীর চাকরি ছাড়তে হয় এবং যথেষ্ট হেনস্তা হতে হয়। পরে জানা গিয়েছিল তার রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য এটা ছিল তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কারসাজি। সম্প্রতি ফেসবুকে প্রচারিত খবর ও ছবিটি কোনো পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অথবা সাজানো কারসাজি কি না, এ সম্ভাবনাও আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না।

আমার বলার কথা, দেশে যখন দুর্নীতিবিরোধী বিশাল শুদ্ধি অভিযান চলছে, তখন তাকে ব্যর্থ করার জন্য নানা ধরনের রঞ্জিত, অতিরঞ্জিত এবং ভুয়া খবর ছড়ানো হতে পারে। এই ব্যাপারে সরকার এবং মিডিয়াকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। নারায়ণগঞ্জের খবরটি অবশ্য মিডিয়ায় এসেছে, কিন্তু এসপি হারুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ কতোটা সঠিক তা তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের পর জানা যাবে।

যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় এই অভিযোগগুলো সত্য, তাহলে তাকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। কারণ আমাদের পুলিশ বাহিনী ইদানীং তাদের কর্তব্যনিষ্ঠা ও যোগ্যতার জন্য যে সুনাম অর্জন করেছে এসপি হারুনের কার্যকলাপে তা নষ্ট হয়েছে। আর যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় এসপি হারুনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলো বানানো এবং সত্য নয়, তাহলে বুঝতে হবে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যারা বহুদিন যাবত দখলদারিত্ব চালাচ্ছেন এবং সর্বপ্রকার দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের গডফাদার, তাদের কায়েমি স্বার্থে হারুন বিঘ্ন সৃষ্টি করাতেই তাকে স্কেপগোট বানানো হয়েছে। 

এসপি হারুনের বিরুদ্ধে অভিযোগের খবরটি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছি এজন্য যে ইদানীং দেশের পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে দুই ধরনের খবর কানে আসছিল। এক, পুলিশ বাহিনী দুঃসাহসী ও দুর্দান্ত হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ সময়ে তাদের কার্যকলাপে মনে হয় দেশটি পুলিশি স্টেটে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে দেশে বিদেশে, এমনকি মিডিয়ায় হাসিনা সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠন, আধুনিকায়ন, সন্ত্রাস ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর অভ্যুত্থান দমনে তাদের সাফল্যের প্রশংসা করা হয়েছে।

চীনের ‘চায়না টাইমস’ পত্রিকা সম্প্রতি বাংলাদেশের পুলিশের প্রশংসামূলক এক বিরাট প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বিশেষভাবে ঢাকায় সাবেক এসপি (বর্তমানে প্রোমোশন পেয়ে এসিস্ট্যান্ট ডিআইজি) হাবীবের জনহিতকর কাজের দীর্ঘ বিবরণ ছেপেছে। চায়না টাইমস-এ তার যোগ্যতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার প্রশংসাতো করা হয়েছেই, সেই সঙ্গে চাকরির দায়িত্বের বাইরে তার জনহিতকর তত্পরতার কাহিনী ছাপা হয়েছে। দেশের উপেক্ষিত ও নির্যাতিত হিজড়া সম্প্রদায় ও বেদে সমাজের জন্য হাবীব নিজের উদ্যোগে বিশাল উন্নয়ন-পরিকল্পনা চালাচ্ছেন। তাদের শিক্ষাদান এবং সমাজে পুনর্বাসনের এই পরিকল্পনা এখন অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

হাবীব সাহেবের মতো সত্, দক্ষ, অনেক পুলিশ অফিসার এখন বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে আছেন এবং এই বাহিনীর চেহারা এখন পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ঝকঝকে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উন্নত পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে তাদের অনায়াসে তুলনা করা যায়। অবশ্য পুরোনো ধ্যান-ধারণার পুলিশ অফিসার যে বর্তমানে নেই, তা নয়। কিন্তু ক্রমশই তাদের সংখ্যা কমছে।

শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বময় পুলিশের ইমেজ আগে কখনো ভালো ছিল না। বাংলাদেশে পুলিশের ইমেজ ছিল ঘুষখোর পুলিশ। ব্রিটিশ, ফরাসি, আমেরিকান গোয়েন্দা উপন্যাসগুলো পড়তে গেলে দেখা যাবে সর্বত্র পুলিশের হাস্যকর, ব্যর্থ ইমেজ। মি. ব্লেকের গোয়েন্দা কাহিনিতে পুলিশ ইন্সপেক্টর বা শার্লক হোমসের কাহিনীর পুলিশ অফিসার রীতিমতো ঠাট্টা তামাসার পাত্র। বাংলাদেশের গোয়েন্দা কাহিনিগুলোতেই তাই।

বিশ্বের সাহিত্য-উপন্যাসে পুলিশকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও অকর্মণ্যতার এই যে দীর্ঘকালের ইমেজ, এটা বদলাতে শুরু করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। পুলিশের আধুনিকায়নের ছোঁয়া স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও এসে লাগে। হাসিনা সরকারের আমলে পুলিশের ট্রেনিং, পোশাক এবং বেতন-ভাতা উন্নত হওয়াতে পুলিশ বাহিনীর যে উন্নতি হয়েছে এবং নতুন ইমেজ গড়ে উঠেছে তা প্রশংসা পাওয়ার মতো। কিছু পুরোনো আমলের দৃষ্টিভঙ্গির অসাধু পুলিশ বা তাদের অফিসারদের কার্যকলাপে তা যেন নষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

কোনো সরকারেরই উচিত নয়, পুলিশ বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা। বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে এই কাজটি এমনভাবে করেছেন এবং দলের ক্যাডার দ্বারা পুলিশ বাহিনী ভর্তি করে ফেলেছিলেন, তা থেকে এই বাহিনীকে মুক্ত করে পুনর্গঠনে সময় লাগছে। বহু অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের একশ্রেণির মন্ত্রী ও এমপিও পুলিশকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থসিদ্ধির কাজে লাগিয়ে পুলিশ বাহিনীকে দুর্নামগ্রস্ত করছেন, নিজেরাও সুনাম হারাচ্ছেন। বর্তমান শুদ্ধি অভিযানে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে এদিকটাতেও সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

ব্রিটিশ শাসকেরা নিজ দেশে পুলিশকে গড়ে তুলেছেন জনগণের সেবক হিসেবে। আর উপনিবেশগুলোতে পুলিশকে গড়ে তুলেছেন জনগণের প্রভু এবং সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার হিসেবে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াতে এজন্যে স্বাধীনতা লাভের পর পুলিশ বাহিনীকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এই দুটি দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বাংলাদেশেও পুলিশ বাহিনীকে আরো ঢেলে সাজানো দরকার। পুলিশ যে ফুলিশ নয়, কেবল ঘুষখোর নয় এই কথাটি সর্বতোভাবে সত্যে পরিণত করা জরুরি।

[ লন্ডন, ৯ নভেম্বর, শনিবার, ২০১৯ ]