রেজাউল হক কৌশিক
দেশের ১০টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণে (সিএআর) ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্য ৫৯টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৭টি ব্যাংক এ বিষয়ে প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে সিএআর ঘাটতির বিষয়টি জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সে পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের প্রভাবে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে, অর্থাত্ জুন মাস শেষে মূলধন ঘাটতি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে ১০টি ব্যাংক। আর ৪৭টি ব্যাংকের বড়ো তিন গ্রাহক যদি খেলাপি হয়ে যায়, তাহলে ২২টি ব্যাংক তাদের সিএআর সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হবে বলেও ঐ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার পাঁচ বছরের সময়সীমা এ বছরই শেষ হবে। তবে এখনো মূলধন সংরক্ষণের নির্ধারিত সীমার ধারেকাছেই যেতে পারছে না অনেক ব্যাংক। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের মধ্যে নির্ধারিত সীমায় মূলধন সংরক্ষণ করা কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নির্ধারিত সীমার মধ্যে মূলধন না আনতে পারলে নানান সমস্যা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়ে ব্যাংকিং খাত। বৈদেশিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি ব্যয় বেড়ে যাবে। কারণ মূলধন ঘাটতি থাকলে ব্যাংকিং খাতের রেটিং খারাপ হয়ে যায়। ফলে পণ্য আমদানিতে দেশীয় ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যত কমে যায়। তখন থার্ড পার্টি গ্যারান্টির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করার প্রয়োজন হয়। এতে খরচ বাড়ে। পরিস্থিতির উন্নতি করতে ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মূলত, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে ঋণ দেওয়ায় ব্যাংকিং খাতে ঋণ আদায় কমে যাচ্ছে। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। আর এই ঋণখেলাপির কারণে ঋণের গুণগত মান কমে যাচ্ছে। যদিও সরকার খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সেসব উদ্যোগ খুব বেশি কার্যকর হচ্ছে না।
বরাবরের মতোই বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি। এ কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। ফলে মূলধন ঘাটতির মুখে পড়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো। আর এর পুরো প্রভাব পড়েছে গোটা ব্যাংকিং খাতে।
ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, একটি ব্যাংকে যখন সুশাসন না থাকে, তখন জাল-জালিয়াতির প্রবণতা বাড়ে। তাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে যায়। ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে যেভাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, তার প্রধান কারণ জালিয়াতি। আর এর প্রভাবে মূলধনের ঘাটতি বাড়ে। মূলধনের ঘাটতি থাকলেই ব্যাংকটির অবস্থা বোঝা যায়।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতি বছরই সরকারি ব্যাংকগুলোর ঘাটতি মেটাতে জনগণের করের টাকা থেকে ব্যাংকগুলোকে মূলধনের জোগান দেয়। কয়েক মাস আগে অর্থমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ব্যাংকগুলোকে আর নতুন করে মূলধন দেওয়া হবে না। এটা যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ব্যাংকিং খাতের জন্য তা ভালো হবে।
