সাইফুল ইসলাম হাফিজ
এই আধুনিক সভ্যতার যুগে আমাদের বেশির ভাগ সময়ই কাটাতে হয় হাইটেক প্রযুক্তির সান্নিধ্যে আর যন্ত্রের ছোঁয়ায়। এখন আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির সাহায্য প্রয়োজন হয়। কারণ, আমাদের নানান চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত আছে প্রযুক্তির নানান আবিষ্কার। এর মধ্যে সবচেয়ে যে প্রযুক্তিটি আমাদের হাতের নাগালে থাকে সেটি হলো—মোবাইল ফোন। এক সময় শুধু প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলার নিমিত্তে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এর পথচলা শুরু হয়। এখন এই মোবাইল ফোন স্মার্ট হয়ে আবির্ভূত হয়েছে স্মার্টফোন নামে! বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৬ কোটি ৩৪ লাখ ১৫ হাজার (বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী)। ২০২০ সালে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী শীর্ষ ১০ দেশের সাত নম্বরে থাকবে বাংলাদেশ। গ্রাহক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও নিত্য নতুন মডেলের স্মার্টফোন বাজারে আনছে। তরুণদের বেশির ভাগই ঝুঁকছে স্মার্টফোনের প্রতি।
বিনোদনের জন্য ব্যবহার শুরু হয়ে এক সময়ে তা আসক্তিতে রূপ নেয়। স্ক্রিন আসক্তি মানে শুধু মোবাইল ফোনে আসক্ত এমনটা নয়। এর পাশাপাশি আছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন আবিষ্কার। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্ব্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ৫ লাখ। বর্তমানে এ সংখ্যা আরো বেড়েছে। এদের মধ্যে ৮ কোটি ৪৭ লাখ মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। অল্প সংখ্যক মানুষ প্রয়োজন কিংবা পেশাগতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু বেশির ভাগই বিনোদন কিংবা সময় কাটানোর জন্য ইন্টারনেটে সংযুক্ত থাকছে। শুধু ইন্টারনেটই আমাদের মূল্যবান সময় কেড়ে নিয়ে তার প্রতি আসক্ত করে তুলছে তা নয়; এর সঙ্গে আছে থ্রি-ডি অ্যানিমেটেড গেমিং, মুভি দেখা ইত্যাদি। সংবাদমাধ্যম ‘ব্যাংকমাইসেল’ ও ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। সেগুলো দেখলে বুঝতে পারব আমরা কতটা ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছি। ব্যবহারকারীরা দৈনিক গড়ে ৪৭ বার তাদের স্মার্টফোন চেক করেন, বছরে তা সংখ্যায় দাঁড়ায় ১৭ হাজার ১৫৫ বার। দৈনিক টাচ বা ক্লিকের সংখ্যা প্রায় ২৭০০ বার। ৮৫ শতাংশ ব্যবহারকারী পরিবার, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডার সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ৮০ শতাংশ ব্যবহারকারীরা বিছানায় ঘুমাতে যাবার মুহূর্তে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ১৮-২৯ বছর বয়সি একজন ব্যবহারকারী গড়ে দৈনিক তিন ঘণ্টা স্মার্টফোনের পিছনে ব্যয় করেন।
এই স্মার্টফোনের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে মানুষ বেশি সময় ব্যয় করে। ফেসবুক, টুইটার, মেসেঞ্জার, ওয়াটসআপ, ইউটিউব ইত্যাদিতে আসক্ত হচ্ছে অনেক তরুণ-তরুণী। কেউ তারকা হওয়ার নেশায়, কেউবা বন্ধু-বান্ধবকে সময় দেওয়ায়। মন খুব স্থির করে ৫ মিনিটের জন্য নোটিফিকেশন আর মেসেজ চেক করতে প্রবেশ করে ঠিক ৫ মিনিটেই বের হওয়া দুঃসাধ্য হয়ে যায়, আবেগের তাড়নায়। ৫ মিনিট হয়ে যায় ৩০ মিনিট কিংবা তার চেয়ে আরো বেশি। তরুণ বয়সের বেশির ভাগ ব্যবহারকারীরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে। কারণ, রাতে স্ক্রিনের আলোতে সময় কাটিয়ে তিমির রাত ঠিকই টুঁটিয়ে দেয় কিন্তু রাঙা প্রভাত আর দেখার সুযোগ হয় না! অনেকে এর পিছনে সময় ব্যয় করতে করতে ডিভাইসের চার্জ শেষ করে ফেলে। যদি হঠাত্ কোনো কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা মোবাইল ফোনটি হাতের নাগালে না পেলেই তার মধ্যে তীব্র হতাশা বা অস্থির ভাব (মেন্টাল ডিজঅর্ডার) লক্ষ করা যায়। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন ‘নমোফোবিয়া’। যা একটি মানসিক রোগ। এই রোগে ভুগছে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই। ফলে খেলার মাঠে দেখা দিয়েছে শূন্যতা, সামাজিক সম্পর্ক দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে, মস্তিষ্কের সৃজনশীলতাও কমে যাচ্ছে। মায়ামমতা হারিয়ে আমরা হয়ে যাচ্ছি যান্ত্রিক। ‘এজিং অ্যান্ড মেকানিজম অব ডিজিজ’ জার্নালে প্রকাশিত নতুন গবেষণা বলছে এটা বার্ধক্যকেও ত্বরান্বিত করতে পারে। তার মানে আমরা ভবিষ্যতে ভয়ংকর ক্ষতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।
আমাদের এই প্রজন্মকে আসন্ন চরম ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে এই ভার্চুয়াল জগত্ থেকে বের হয়ে আসতে হবে বাস্তব পৃথিবীতে। অভ্যাস পরিবর্তন করে এই আবেগহীন যান্ত্রিক দুনিয়া থেকে বের হয়ে আসার সময় এখনই। নইলে আমাদের ভবিষ্যত্ ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন হয়ে যাবে। আমরা ভবিষ্যতে জাতিকে কিছুই দিতে পারব না। তাই এর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমাতে হবে। আসক্ত ব্যক্তি নিজে এর থেকে মুক্তি পেতে পারবে না। এর জন্য অভিভাবকদের অনেক সচেতন হতে হবে এবং সুশীল সমাজেরও এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমে এর ক্ষতিকর দিকগুলো প্রচার করে এই প্রজন্মকে এর ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে হবে। অতিরিক্ত আসক্তদের চিকিত্সা দেওয়ার জন্য স্বতন্ত্র চিকিত্সা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। অন্যথায়, আমাদের জ্ঞানহীন, প্রেমহীন, অন্ধকারাবৃত একটি ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা কবির ও জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারব না। তিমির রাত টুঁটিয়ে রাঙা প্রভাত আনতে ব্যর্থ হবে এই প্রজন্ম।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
