গত বছর আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের জন্য থিম নির্ধারণ করেছিল—‘পরিবার এবং ডায়াবেটিস’। এবছরও তারা একই থিম রেখে দিয়েছে। এ থেকেই অনুমান করা যায় পরিবার এই রোগের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পেইনে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা, যত্ন, প্রতিরোধ এবং এসংক্রান্ত শিক্ষা বিষয়ে পরিবারের ভূমিকার ওপর পুনরায় গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রতিদিন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ইনসুলিন কেনা ও রোগ মনিটর করা একটি পরিবারের জন্য বেশ ব্যয়বহুল বিষয়। তাই পরিবারের অন্য সদস্যদের ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জ্ঞানার্জন জরুরি।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে প্রায় ১ কোটি, বছরে বাড়ছে আরো ১ লাখ রোগী। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করলে রোগী নিজেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সব বয়সের মানুষই আজ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিবছরই দ্বিগুণহারে বাড়ছে নতুন নতুন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা। সচেতনতার অভাবে অনেকেই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে সারাবিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০ম স্থানে। এ রোগের চিকিত্সায় শর্করা নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়, শর্করার মাত্রা বৃদ্ধিজনিত সমস্যাগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তবেই ভবিষ্যতের জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম এবং প্রয়োজনে ওষুধের ব্যবহার। একটা কথা ভুললে চলবে না যে, শুধু ওষুধের সাহায্যে কখনো এই অসুখ সারানো সম্ভব নয়। অন্য দুটি নিয়ম পালন করা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফিজিক্যাল এক্সারসাইজের ব্যাপারটা বিশেষ করে মাথায় রাখা বিশেষ প্রয়োজন।
ডায়াবেটিস ডেকে আনতে বাড়তি স্ট্রেসের একটা প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। গবেষণায় জানা গেছে, ডায়াবেটিসের একটা মেজর রিস্ক ফ্যাক্টর হলো স্ট্রেস। সুতরাং স্ট্রেস কাটাতে আড্ডা দিন, গান শুনুন, ধ্যান ও নিউরোবিক জিম করুন বা বেড়াতে যান—ধূমপান, মদ্যপান করে বিপদ ডেকে আনবেন না। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে ব্যায়াম করুন, পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটুন। গবেষণায় দেখা গেছে ব্যায়াম করলে দেহকোষের ইনসুলিন রিসেপটারের সংখ্যা বাড়ে। মানসিক চাপগ্রস্ত হলে শরীর হয় উত্তেজিত। সামান্য শিথিলায়ন ব্যায়াম ও অন্যান্য স্ট্রেস মোকাবিলার কৌশল রক্তে সুগারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আট ঘণ্টা ঘুমান তাদের তুলনায় যাদের ঘুম রাতে ছয় ঘণ্টার কম হয় এদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি দ্বিগুণ। সুনিদ্রার জন্য বিকাল থেকে চা-কফি, চকলেট গ্রহণ করা উচিত নয়। ঘরে অফিসের কাজ নিয়ে আসবেন না। রাত জেগে টিভি দেখবেন না। মোবাইল অফ করে ঘুমাবেন। বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সুস্থ জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সুস্থ জীবনযাপন মানে হচ্ছে—স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং মন সুস্থ রাখা। মন সুস্থ রাখতে হলে মনের ওপর চাপ নেওয়া যাবে না।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য হলিস্টিক পদ্ধতি এখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। হলিস্টিক পদ্ধতি হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীন প্রাকৃতিক পদ্ধতির আশ্চর্য সমন্বয়। এই চিকিত্সার মূল চাবিকাঠি দুইটি। স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম। রোগীর বয়স ও রোগের ধরন এবং তার বর্তমান অবস্থার ওপরই নির্ভর করে তার প্রতিদিনের খাদ্যগ্রহণ। পুষ্টিকর ও পরিমিত আহার তাকে ফিট রাখে। আর ব্যায়ামের ব্যাপারটি বিবিধ। তার আগে মন নিয়ন্ত্রণের জন্য চাই সঠিক উপায়ে মেডিটেশন। মানসিক চাপই মানুষের অসুখ ও অশান্তির মূল কারণ। মানসিক চাপ কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
n লেখক :চিকিত্সক
e-mail: [email protected]
