নারায়ণগঞ্জে ‘বিল্ডিং কোড’ না মেনে ভবন নির্মাণ

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৬

নারায়ণগঞ্জকে এখন অট্টালিকার শহর বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু কটি ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি ? নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন থেকে এ বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য মেলেনি। দুটি সংস্থা থেকেই বলা হয়েছে রাজউকের কথা। তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ১০টি ভবনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মানেনি।

গত ৩ নভেম্বর শহরতলির বাবুরাইল তাঁতীপাড়া হামিদ মুন্সীর বাড়ি এলাকায় একটি চারতলা ভবন ধসে পড়ে। এতে দুই স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়। আহত হয় পাঁচ-সাত জন। অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন ভবনগুলো ‘বিল্ডিং কোড’ না মেনেই করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন একাধিক ভবন নির্মাণ করে বিক্রি করলেও এর কোনোটাতেই পার্কিং প্লেসসহ ‘বিল্ডিং কোড’ ঠিকমতো মানা হয়নি।  ধসেপড়া ঐ ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল জোড়াতালি দিয়ে। খালের পাড়ে একতলার ফাউন্ডেশন দিয়ে তার ওপর একে একে চারতলা ভবন তৈরি করা হয়েছিল। চারতলার কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই ভবনটি ধসে পড়ল। এ ঘটনায় ভবন মালিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জেলায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একের পর এক গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। খাল-বিল ও ডোবা-নালা ভরাট করে তৈরি করা হচ্ছে ভবন। বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনাতো মানা হচ্ছেই না, এমনকি অগ্নিনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও মানছেন না প্রভাবশালী এসব ভবন মালিক। আর এভাবেই প্রতিদিনই অনিরাপদ হয়ে উঠছে নগর জীবন।

জানা গেছে, বিভিন্ন জেলা শহরে সাধারণত বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদন দিয়ে থাকে পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে বাড়ি নির্মাণ ও ভবনের প্ল্যান অনুমোদন দেয় রাজউক। তবে ষষ্ঠতলার বেশি অর্থাত্ বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা প্রশাসকের গঠন করা কমিটির অনুমোদন দিতে হয়। সেক্ষেত্রে বহুতল ভবন নির্মাণে মাটি পরীক্ষা, অবকাঠামোগত সুবিধা, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ১০টি নিয়ম মানার কথা রয়েছে ইমারত আইনে। অথচ গড়ে ওঠা এসব ভবনের সিংহভাগই নিয়ম না মানার দলে। অনেক ভবন মালিকেরও নেই ছাড়পত্র। বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদন ও প্ল্যান পাশ করে রাজউক। এ কারণে নারায়ণগঞ্জে অনিয়ম ধরা যায় না। রাজউক এ কাজ সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দিলে বিল্ডিং কোড না মেনে কেউ ভবন করতে পারবে না বলে মনে করেন সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠা অনেক ভবনেরই অনুমোদন নেই। প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে থাকার কারণে ভবন মালিকরা ইমারত আইনের তোয়াক্কা করছেন না। 

শহরের বাবুরাইল তাঁতীপাড়ার বাসিন্দা বেলাল হোসেন জানান, বর্তমানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে তোলা হচ্ছে একের পর এক বহুতল ভবন। যাদের বেশির ভাগই গড়ে উঠছে নিয়মনীতির বাইরে। এতে ভূমিকম্পসহ যে কোনো দুর্যোগে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকছে। আমাদের এলাকার লোকজন কোনো নিয়মই জানে না। মানার তো প্রশ্নই আসে না। যদি নিয়ম মানত তাহলে কেউ কি একতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে চারতলা বিল্ডিং উঠাতে যেত।  দেওভোগের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, বিল্ডিং কোডের পাশাপাশি শহরে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি অতীব জরুরি হলেও মানছেন না ভবন মালিকেরা।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আরেফিন জানান, বাড়ি নির্মাণ তো বটেই, বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যারা আইন মানছেন না, তারা নিজের অজান্তেই মৃত্যুকে কাছে ডেকে আনছেন। এক্ষেত্রে অনুমোদন  দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আরো কঠোর ও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ তার। তা না হলে ছোটো-খাটো দুর্ঘটনাতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। জেলা গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মনীতি মানা অত্যাবশ্যক। এতে কোনোরূপ শিথিলতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কঠোর আইন আছে। এ ছাড়া ভবন নির্মাণ আইন না মানলে নিজের অজান্তেই অনিরাপদ ভবন তৈরি হবে। যা কোনোভাবেই কারো জন্য কাম্য নয়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা এ এফ এম এহতেশামুল হক জানান, নানা ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে তাদের। তার দাবি, আইন না মানা ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত মাঠে নামবে নাসিক কর্তৃপক্ষ।