প্রয়োজন ৪ হাজার আছেন ৪৬৩ জন

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২২:২৪

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে চরম নার্স সংকট বিরাজ করছে। এ হাসপাতালে প্রয়োজন ৪ হাজার নার্স। অথচ আছে মাত্র ৪৬৩ জন। এতে চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। সরেজমিনে দেশের অন্যতম প্রাচীন হাসপাতালে গিয়ে নার্স সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হওয়ার করুণ চিত্র দেখা গেছে। দেশের সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিত্র একই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুসারে ডাক্তার-নার্সের অনুপাত ১:৩ হওয়ার কথা। সেখানে বাংলাদেশে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে এই অনুপাত ১:০.৫৬। বর্তমানে দেশে ৬৬ হাজারের কিছু বেশি রেজিস্টার্ড চিকিত্সক রয়েছেন। প্রটোকল অনুসারে সেখানে দুই লাখের বেশি নার্স থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রেজিস্টার্ড নার্সের সংখ্যা মাত্র ৪১ হাজার। তার মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি নার্স বেকার। এছাড়া সরকারি ১২০ জনের লিয়েনসহ মোট ১ হাজার ১০০ জন নার্স বিদেশে কর্মরত আছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুসারে যেখানে সাধারণ ওয়ার্ডে চার জন রোগীর জন্য একজন নার্স থাকা দরকার সেখানে বাংলাদেশে দেখা যায়, ৩০-৩৫ জন রোগীর পুরো ওয়ার্ডেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে একজন নার্সকে। অন্যদিকে আইসিইউ বা বিশেষায়িত অথবা সমপর্যায়ের জটিল পরিস্থিতিতে রোগীপ্রতি একজন নার্স থাকার কথা, কিন্তু দেখা যায় একজন নার্সের আওতায় সাত-আট জন কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি রোগী থাকেন। মিটফোর্ড হাসপাতালে বিশেষায়িত ইউনিটে কোনো নার্সই বরাদ্দ নেই।

হাসপাতালটি ৯০০ বেডের। এছাড়া অতিরিক্ত বেড আছে ৬৫টি। এর অধীনে আছে এনআইসিইউ (শিশু আইসিইউ) বেড আছে ২০টি। আইসিইউ বেড আটটি, এসডিইউ বেড ছয়টি, ডায়ালাইসিস ইউনিটে সাতটি বেড ও বার্ন ইউনিটে আটটি বেড আছে। অতিরিক্ত ৬৫ বেডের জন্য নার্স বরাদ্দ করা হয়নি। উল্লিখিত অতিরিক্ত বেডের জন্য ৪৬৩ জন নার্সদের মধ্য থেকে নার্স এনে নার্সিং সেবা প্রদান করা হচ্ছে। টিনশেডের আইসিইউতে পানিও পড়ছে। এছাড়া মিটফোর্ড হাসপাতালে চার জন সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ১০টি সুপারভাইজারের পদ শূন্য। নার্সসহ জনবল সংকট নিরসন করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কয়েক দফা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও নার্সিং অধিদপ্তরে তাগিদ দিয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এক্ষেত্রে কেউ যেন কিছু করতে চান না। অথচ চিকিত্সা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নার্সদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স যথেষ্ট সংখ্যক রয়েছে দেশে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী পদ সৃষ্টি করা হয় না বলেই তাদের পদায়ন করা যাচ্ছে না। ফলে চাহিদার পাঁচ ভাগের এক ভাগ নার্স নেই দেশে। নার্স সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করায় রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

মিটফোর্ড হাসপাতালের নার্সিং সুপার আনওয়ারা বেগম ও ডেপুটি নার্সিং সুপার হালিমা আক্তারের সঙ্গে কথা হয় ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধির। তারা বলেন, চাহিদার তুলনায় নার্স সংকট অনেক বেশি। মাত্র ৪৬৩ জন নার্স আছেন। এদের মধ্যে দৈনিক ১০০ জন নার্স ছুটিসহ নানা কারণে ডিউটিতে আসতে পারেন না। তার পরও সর্বাত্মক সেবা প্রদানের চেষ্টা করে থাকেন নার্সরা। বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জনবল বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এ সংকট নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি তৃণমূল পর্যায়ের অবস্থা অনুধাবন করত তাহলে এ সমস্যার সমাধান হতো।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোর্শেদ রশীদ ইত্তেফাককে জানান, নার্স সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। চাহিদার তুলনায় সীমিতসংখ্যক নার্স দিয়েই রোগীদের চিকিত্সা সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

নার্সিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে খোদ চিকিত্সকদের মধ্যেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও অবহেলিত খাত হচ্ছে নার্সিং বিভাগ। অথচ নার্সিং সেবা সবচেয়ে বেশি কার্যকর করা দরকার। যে কোনো মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ত্রিমুখী ব্যবস্থাপনায় চলে। এর একটি হাসপাতাল প্রশাসন, একটি মেডিক্যাল কলেজ প্রশাসন, অন্যটি নার্সিং প্রশাসন। অথচ নার্সিং প্রশাসনই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। এমন নয় যে দেশে প্রশিক্ষিত নার্স নেই, মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথসহ (এমপিএইচ) দেশ-বিদেশের উচ্চতর ডিগ্রিধারী সহস্রাধিক নার্স রয়েছে। তাদেরকে নার্সিং অধিদপ্তরসহ উপযুক্ত স্থানে পদায়ন করা হলে মিটফোর্ডসহ দেশের সকল হাসপাতালের নার্সদের অব্যবস্থাপনা কেটে যেত। নার্সদের পদোন্নতিসহ মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাও বাস্তবায়ন হয়ে যেত।