পলিথিনমুক্ত জীবন ও পরিবেশ চাই

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ২২:০১

আমাদের জীবন ও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে পলিথিনের সম্পর্ক ও ব্যবহার। পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্থ ডে নেটওয়ার্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী  বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণে বাংলাদেশ দশম। আমাদের দেশের বর্জ্যের প্রায় ৮ শতাংশ প্লাস্টিক। শুধু ঢাকা শহরে প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিব্যাগ পরিত্যক্ত হয়; সুতরাং সারা দেশে পলিথিনের ব্যবহার অনুমান করা সহজ বিষয়। ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ পলিথিন।  পলিথিন তৈরির কারখানার সংখ্যা প্রায় চার হাজার, যেখানে প্রায় ২০ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত। এগুলোর বেশিরভাগই পুরান ঢাকায়। এছাড়া কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, কামরাঙ্গীচর, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এবং ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রামে কারখানা রয়েছে।

পলিথিন হচ্ছে স্লো পয়জন যা আমাদের জীবন ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। পলিথিন মানব শরীরে শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা ও ক্যানসার সৃষ্টি করতে সক্ষম। চিকিত্সাবিজ্ঞানে পলিথিনকে চর্মরোগের এজেন্ট বলা হয়। উজ্জল রঙের পলিথিনে রয়েছে সিসা ও ক্যাডমিয়াম, যার সংস্পর্শে দেখা দেয়। পলিথিনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে। বর্তমানে ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যত্বের যে প্রকট সমস্যা তার মূলে রয়েছে পলিথিনের ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রভাব। পলিথিন থেকে বিষফোনোল নামক রাসায়নিক নির্গত হয়, যা খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মিশে নানা রকমের রোগ তৈরিতে সহায়তা করে। পলিথিন প্যাকিংয়ে অবায়ুবীয় ব্যাকটিরয়ার সৃষ্টি হয়, যে খাবার খেলে রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মাটিতে পলিথিনের কারণে রাসায়নিক পদার্থ বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যেমে বৃক্ষের মাধ্যমে অবশেষে মানুষের শরীরে মিশে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে।

পলিথিন মানব শরীরের পাশাপাশি পরিবেশের জন্যও মারত্মক হুমকি। পলিথিন এমন একটি পদার্থ যার আয়ুষ্কাল হাজার বছর। অপচনশীল পদার্থ হওয়ায় দীর্ঘদিন অবিকৃত অবস্থায় থাকে বলে মাটিতে সূর্যালোক, পানি ও অন্যান্য উপাদান প্রবেশে বাধা দিয়ে মাটির উর্বরতা কমায়। এভাবে মাটির উর্বরতা কমতে থাকলে আগামীতে অধিক উত্পাদনশীল ফসলি জমির সংকটে পড়তে হবে। পতিত পলিথিন মাটির অভ্যন্তরে উপকারী ব্যাকটেরিয়া, পানি ও প্রাকৃতিক পুষ্টি চলাচলে বাধা দেয়, যার কারণে মাটির গুণগত মান হ্রাস পায়। পলিথিন উত্পাদন প্রক্রিয়ায় গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে সহায়ক। সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি বছর প্লাস্টিক উত্পাদনে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়। ১ কেজি প্লাস্টিক উত্পাদনে ২ থেকে ৩ কেজি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে।

২০০২ সালে পলিথিনের উত্পাদন, পরিবহন, মজুদ, ব্যবহার আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়। পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে ১৭টি পণ্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।  কিন্তু বর্তমানে পলিথিন যে নিষিদ্ধ তা বোঝার উপায় নেই। বাজারের প্রায় মুদি, মাছ, মনোহরি, খাবার, ওষুধের দোকান এমনকি হাসপাতালসহ এমন কোনো স্থান নেই যেখানে পলিথিন মেলে না। শুধুমাত্র পরিবেশ দিবসে সরকারসহ বিভিন্ন মহলের আলোচনা-সমালোচনা দেখা গেলেও সারা বছর তেমন কর্মসূচি কই?

পরিবেশ ও আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় পলিথিন বর্জনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকার আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে আরো বেশি কার্যক্রম গ্রহণ এবং সারা বছর অভিযান পরিচালনাসহ তদারকির মাধ্যমে পলিথিন বন্ধে উদ্যোগ নেবে বলে আশা করি। সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলোতে পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে এবং পলিথিন ব্যবহার না-করতে জনসচেনতা তৈরি একান্ত প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কিংবা শহর এলাকায় বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি খাল-বিল, পুকুর, নদী-নালা, রাস্তাঘাট ও ড্রেনের পরিত্যক্ত পলিথিন পরিষ্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠুক—এটাই প্রত্যাশা।

মুন্সীগঞ্জ