ভয়াবহ রোগ ছড়াচ্ছে নকল প্রসাধনী

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ২২:২৬

রাজধানীর ফুটপাথ থেকে শুরু করে অভিজাত বিপণীবিতানসহ সারাদেশে এখন প্রকাশ্যে নকল-ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ সুগন্ধি ও প্রসাধনী সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। কোন অনুমোদন ছাড়াই রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকায় যত্রতত্র কারখানা বসিয়ে নকল প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রির দেদারছে উত্পাদন চলছে। তারা দেশি-বিদেশি মোড়কে বিভিন্ন ধরনের ক্রিম, লোশন, বিউটি সোপ, ফেস ওয়াশ, শ্যাম্পুসহ হরেক রকম প্রসাধনী উত্পাদন করে তা ব্যাপকভাবে বাজারজাত করে চলেছে। সৌন্দর্যপিপাসু নারী ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন এসব প্রসাধনী কিনে। ভেজাল প্রসাধনীতে ব্যবহূত কেমিক্যালে রয়েছে আর্সেনিক ও লেদ সীসা। আর এসব প্রসাধনী ব্যবহার করে নারী-পুরুষ ক্যান্সার, চর্ম, কিডনি, নিউরোপ্যাথিসহ লিভরের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া বিকলাঙ্গ শিশুরও জন্ম দিচ্ছে।

নকল প্রসাধনী ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ও বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। গবেষণায় দেখা গেছে, নকল প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহূত কেমিক্যালে আর্সেনিক রয়েছে। পরীক্ষায় এটাপ্রমাণিত। আর এই কেমিক্যালে তৈরি প্রসাধনী ব্যবহারে জন্মগত ত্রুটি দেখা দেয়। স্পাইনালকর্ড থাকার কথা মেরুদন্ডে। এই নকল প্রসাধনী ব্যবহারের ফলে অনেকের স্পাইনালকর্ড থাকছে মেরুদন্ডের বাইরে। এছাড়া স্কিন ক্যান্সার, চুল পড়া, ডায়াবেটিকস ও চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ নকল প্রসাধনী ব্যবহার। নকল প্রসাধনীতে যে লেদ সীসা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে তা আগেই প্রমাণিত। এই লেদ সীসা নিউরোপ্যাথি বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ। নিউরোপ্যাথি হলো নার্ভগুলোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। পরে প্যারালাইজড বা পঙ্গু হয়ে যাওয়া। চিকিত্সকরা জানান, ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহারে ত্বকের সাধারণ লাবণ্য নষ্ট হয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে ব্যবহারকারীর কন্ট্র্রাক ডারমাটাইসিস হয়, চামড়া লাল হয়ে যায়। পরে অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন তৈরি করে। তারা আরো বলেন, ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহারে স্কিন ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি ত্বকে দানা, হাঁপানি, মাথাব্যথা ও চোখ জ্বালাপোড়াসহ অন্যান্য রোগেরও উপদ্রব হয়।

র্যাবের মোবাইল কোর্ট গত ১৩ নভেম্বর কেরানীগঞ্জে একটি ধানক্ষেতের মধ্যে নকল প্রসাধনী তৈরির ফ্যাক্টরির সন্ধান পায়। এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। অভিযানে আট কোটি টাকা মূল্যের নকল পণ্যসামগ্রী উদ্ধার করা হয়। এই ফ্যাক্টরির তিন মালিকসহ ছয় জনকে জেল-জরিমানা করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আটক তিন মালিক মোবাইল কোর্টকে জানায়, চীন থেকে তারা নতুন কৌটা আমদানি করে নিয়ে আসে। ওই সকল কৌটার মধ্যে নকল প্রসাধনী ভর্তি করে বিদেশি ব্রান্ডের মোড়ক লাগিয়ে বিদেশি পণ্য বলে বাজারজাত করে আসছে দীর্ঘদিন। তবে তারা চকবাজারেই সাধারণত বেশিরভাগ নকল বিদেশি ব্রান্ডের পন্যসামগ্রী সরবরাহ করে থাকে। গত এক বছরে এই ধরনের বড় প্রায় ৬০টি নকল প্রসাধনী তৈরির কারখানার সন্ধান পায় র্যাবের মোবাইল কোর্ট। এসব কারখানায় বিপুল পরিমাণ বিদেশি ব্রান্ডের নকল প্রসাধনী জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। র্যাবের ম্যাজিস্ট্রের সারোয়ার আলম বলেন, চকবাজারের ৭৫ ভাগ প্রসাধনী সামগ্রী নকল। গুলশান-১ নম্বরে ডিসিসি মার্কেটেও বিপুল পরিমাণ নকল প্রসাধনী জব্দ করা হয়। সেখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, তারা সাধারণত চকবাজার থেকেই বিদেশি ব্রান্ডের নকল প্রসাধনী এনেই বিক্রি করে আসছেন।

একাধিক সংস্থার অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে, রাজধানী ও এর আশপাশে গড়ে উঠেছে বড়-ছোট ১০ সহস্রাধিক নকল প্রসাধনী তৈরির কারখানা। এসব কারখানা বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়াই নকল ফেয়ার এ্যান্ড ল্যাভলী, ম্যাক্স ফেয়ারনেসসহ বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির ফেসওয়াশ ও ক্রিম তৈরি হয়। বিএসটিআইয়ের নকল সিল মারা হয়। চকবাজারের একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, দুবাই ও থাইল্যান্ডের নামী-দামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনীর নকল মোড়ক চীন থেকে বানিয়ে আনে। নকল মোড়কে ভেজাল পারফিউম সরবরাহকারীরা পৌঁছে দেয় বড় বড় শপিংমলে। প্যানটিন, ডাভ, হেড এ্যান্ড সোল্ডার, সানসিল্ক, ক্লিয়ার, হেভক, হেক্সি, এক্স, ডয়েট, ভিট— সবই নামী-দামী প্রসাধনী ব্র্যান্ডের নকল পণ্য। এসব পণ্যের পাইকারি মার্কেট পুরান ঢাকার চকবাজার। সেখান থেকে এসব পণ্য সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে; যাচ্ছে ঢাকা শহরের অভিজাত শপিংমলে।

সরেজমিনে, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করে ভেজাল প্রসাধনী হকারদের লাইন ধরে বিক্রি করতে দেখা যায়। রয়েছে লরিয়েল, ল্যাকমে, মেবেলিন ও গার্নিয়ারের মতো ব্র্যান্ডের নকল পণ্য। এসব পণ্যের প্রতি নারীদের আকর্ষণ বেশি। চাহিদা থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও অনলাইন দোকানগুলোয় কসমেটিকসের আসল ছবি দিয়ে নকল পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। সাধারণত এসব বিক্রেতার অধিকাংশেরই কোনো স্থায়ী দোকান থাকে না। ফলে ক্রেতাদের পণ্য বাছাই করে নেওয়ার সুযোগ নেই।

বিএসটিঅইর তথ্যে জানা যায়, দেশে সরকারি অনুমোদন রয়েছে এমন ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রসাধনী উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম। এ যাবত্ ৯৭টি প্রতিষ্ঠানকে সিএম লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। পুরান ঢাকার চকবাজার, মৌলভীবাজার, বড়কাটরা, সদরঘাট, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, রহমতগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, ইসলামবাগ, বংশাল, শ্যামপুর, কদমতলী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, পোস্তগোলা, ধোলাইখাল, ফরিদাবাদ, ইসলামপুর, সোয়ারীঘাট, দেবীদাস লেন, কামালবাগ, শহীদনগরে রয়েছে নকল কারখানার ছড়াছড়ি। এছাড়া কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরার লছমানগঞ্জ, বুড়িশুর, মান্দাইল, কালিন্দিতে আছে শতাধিক নকল কসমেটিকস কারখানা। টঙ্গীসহ রাজধানীর পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জের পাগলার বেশ কয়েকটি জায়গায় নকল প্রসাধন তৈরির গুদাম ও কারখানা রয়েছে। বাজারে প্রচলিত প্রসাধনীর বোতল বা কৌটা, লেবেল ও ট্রেডমার্ক নকল করে হুবহু নকল তৈরি করছে এসব চক্র। গুলিস্তান এলাকার গোডাউনগুলো থেকে প্রতিদিন ভোরে নকল স্টিকার ও লেবেল লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি ও প্রসাধনীসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে পাইকারী দোকানগুলোতে। চকবাজারের চক সার্কুলার রোডের চকসুপার মার্কেট, চকমোগলটুলী, মনসুর প্লাজা, মকিম কাটারার ফালু সুপার মার্কেট, মমতাজ মার্কেট, রুই হাট্টা লেন, খান মার্কেট, ফ্রেন্ডশিপ মার্কেট, মৌলভীবাজার, জোহা মার্কেট, শামীম মার্কেট, ফেন্সি মার্কেট ও বড়কাটারা এলাকায় দুই শতাধিক ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান আছে।

ক্যান্সার, গাইনি, কিডনি, শিশু, লিভার, ডায়াবেটিকস, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে মরণব্যাধি ক্যান্সার, কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিকসসহ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি নকল প্রসাধনী।