ঘরে নারীর অবস্থানের উন্নতি নেই

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৪৩

সামাজিক বাধা ডিঙিয়ে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নিজের ঘরেই নারীর অবস্থানের উন্নতি হয়নি। সমতা আসেনি নারী-পুরুষের কাজে। আমরা কথায় কথায় বলি, সময় বদলে যাচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বৃত্ত ভাঙছে। নারীরা এগিয়ে আসছে। কিন্তু গবেষণা প্রতিবেদন দেখলে বোঝা যায়, নারীর অবস্থান এখনো সেই প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক সমাজেই রয়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে, কর্মজীবী নারী ও পুরুষের মধ্যে নারী দ্বিগুণ কাজ করেন। একজন পুরুষ অফিসের কাজ করে বাসায় ফিরে খুব কমই ঘরের কাজে অংশ নেন। এর বিপরীতে অফিসের কাজের পরে ঘরের কাজের বোঝা নারীর জন্য পরিণত হয় গলার ফাঁসে। সৃষ্টিশীল কর্মজীবী নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা নিয়ে টিকে থাকা তাই পুরুষের  চেয়ে বহুলাংশে কঠিন।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পুরুষরা নারীর ক্ষমতায়নকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। সমাজ নারীদের ওপর অতিরিক্ত শ্রমের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ায় এই ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতার স্বাদ থেকে তারা যেমন বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি তাদের মানসিক যন্ত্রণাও বাড়ছে। বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্র অনেকদূর এগিয়েছে। কিন্তু পরিবারে তাদের অবস্থান বদলাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিকভাবে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। আগে যেটা শুধুই পুরুষের কাজ বলে বিবেচিত হতো সে সব কাজেও নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে যেসব কাজ নারীর কাজ বলে বিবেচিত হতো এখনো তা নারীর কাজই রয়ে গেছে। সে সব কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ খুব সামান্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, একজন কর্মজীবী নারী পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ কাজ করেন। তবে কর্মজীবী নারীর গৃহস্থালি কাজের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন করা হয় না বলেই এর গুরুত্ব দৃশ্যমান হয় না। বিবিএস পরিচালিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপে কর্মজীবী নারীর ঘরের কাজকে দ্বিগুণ বোঝা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য আমরা অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু নারী ক্ষমতায়িত হলে পুরুষ নারীর ক্ষমতায়নটাকে কিভাবে গ্রহণ করবে সেটা নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। পুরুষরা নারীর এই ক্ষমতায়নকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত না। পুরুষদের প্রস্তুত করে তোলার কোনো উদ্যোগও আমরা নিইনি। সে কারণে পুরুষ কোনোভাবেই নারীর এই কাজগুলো করতে প্রস্তুত না। পুরুষদের ঘরের কাজে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করতে হলে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষার প্রয়োজন। সেই শিক্ষা শুরু করতে হবে স্কুল থেকে, ঘর থেকে। একটি পরিবারের শিশু যদি তার মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজে অংশ নেয়, সেই শিশুটি যখন বড়ো হবে তখন সেও ঘরের কাজ করবে। সেই কাজকে তখন সে মেয়েদের কাজ বলে মনে করবে না। একইভাবে একটি পরিবারে যদি বাবা ঘরের কাজে অংশ নেন তখন সন্তানরাও সেই কাজে অংশ নেবে। এর পাশাপাশি ছেলেশিশু যদি ছোটোবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজে অংশ নেয় সে বুঝতে শিখবে এই কাজটি কত কঠিন। এটা করতে শ্রম এবং সৃষ্টিশীলতার প্রয়োজন। তখন সে কাজটিকে সম্মান করতে শিখবে।

নারীদের শ্রম বাজারে অংশগ্রহণ বাড়লেও তাদের ঘরের কাজ নিয়মিতই করতে হচ্ছে। এখান থেকে এখনো পর্যন্ত নিস্তার নেই। অন্যদিকে অনেক পুরুষ সদস্য তার কর্মজীবী স্ত্রীর মতোই অফিস করেও ঘরের কোনো কাজ করছেন না অথবা তাকে সহযোগিতাও করেন না। আবার অনেক পরিবার এমন শর্তই দিয়ে থাকে যে, আগে সংসার, স্বামী আর বাচ্চা সামলাতে হবে। তারপর বাইরে চাকরি করা যাবে। অধিকাংশ নারী তা মেনেই বাইরে যাচ্ছেন এবং কাজ করছেন।

জরিপ মতে, স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী এমন পরিবারে শতকরা ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই রান্নার কাজ করেন নারী। অন্যদিকে কর্মজীবী পুরুষ যারা রান্না করেন তাদের সংখ্যা মাত্র আড়াই শতাংশ। এছাড়াও ১০০ জন কর্মজীবী নারীর মধ্যে ৮৯ জনই কাপড় ধোয়ার কাজ নিজেরা করে থাকেন। অন্যদিকে মাত্র ১২ শতাংশ পুরুষ তাদের নিজের কাপড় নিজেরা ধুয়ে থাকেন। পুরুষদের কাপড় ধোয়ার কাজ করেন মূলত বাড়ির অন্য নারী অথবা গৃহকর্মীরা। কর্মজীবী নারীর মধ্যে ৫৩ শতাংশ নারী পরিবারের অন্য সদস্য যেমন—শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ সদস্যদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। পক্ষান্তরে মাত্র ২১ শতাংশ কর্মজীবী পুরুষ এ দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে ২৬ শতাংশ কর্মজীবী নারী চাকরির পাশাপাশি সংসারের জন্য কেনাকাটার দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। জরিপ বলছে, এসব কাজের বাইরেও সংসারের অন্য কাজগুলোতে কর্মজীবী নারীর অংশগ্রহণ কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। জরিপে বলা হয়, কর্মজীবী নারীরা পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন না।

এ প্রসঙ্গে মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু ইত্তেফাককে বলেন, নারীর এ অবস্থান পরিবর্তনে সমাজ ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। পুরুষকে পারিবারিক কাজে সমান দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা দেখি একজন কর্মব্যস্ত পুরুষের স্ত্রী তার চাকরি ছেড়ে পার্টটাইম কাজ করেন অনেকে একেবারেই ছেড়ে ঘরের দায়িত্ব নিয়ে নেন। কারণ অফিসের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে বাসার সব কাজের যে ভার তাকে বহন করতে হয়, সেটা তিনি নিতে পারেন না। এটা নারীর প্রতি এই সমাজের, পুরুষের অবহেলা। নারীর প্রতি এই অমানবিক আচরণ বন্ধ করতে হবে। নারীরা কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে চললেও বাসায় পুরুষতান্ত্রিক বাধা কাটাতে পারছে না। নারীর সামনে ঘরের এই পুরুষতান্ত্রিক বাধা এখন কাটিয়ে ওঠাই বড়ো চ্যালেঞ্জ।

এদিকে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, মাত্র ছয়টি দেশে নারী-পুরুষের সমতা আছে। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে নারী বৈষম্যের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর এসেছে ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। যা খুবই নিচের দিকে। ‘নারী, ব্যবসা ও আইন ২০১৯ শীর্ষক’ এই প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য বিশ্বব্যাংক গত ১০ বছর ধরে বিশ্বের ১৮৭টি দেশে পর্যবেক্ষণ চালিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একই স্কোর-৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ অর্থাত্ অবস্থার উন্নতি হয়নি।