বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ‘মূল হোতা’ হিসাবে শেরেবাংলা হলে আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমানকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে মিজান মূল হোতা এবং সূচনাকারী হিসেবে চিহ্নিত।’ আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমানই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিনকে বলেছিলেন, ‘আবরার ফাহাদকে তার শিবির বলে সন্দেহ হয়।’ আবরার হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে এসব কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে, কতটা পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করে আবরারকে হত্যা করা হয়। কে কখন কীভাবে আবরারকে নির্যাতন করেছে, কার কী ভূমিকা ছিল, তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ক্রিকেট স্টাম্প, মোটা দড়ি দিয়ে নির্যাতন করার একপর্যায়ে আবরার ফাহাদ বমি ও প্রশ্রাব করে ফেলেন। এরপর তাকে হলের বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। বদলানো হয় তার জামা-কাপড়।
চার্জশিটে বলা হয়, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় মুজতবা রাফিদ তার সহযোগী ইফতি মোশাররফ ও মেহেদী হাসান ওরফে রবিনকে জানান, ‘তিনি বাড়ি যাবেন। আবরারকে ধরলে আজই ধরতে হবে।’ তাদের মধ্যে যখন এই কথোপকথন চলছিল, এর কিছুক্ষণ পর হোসেন মোহাম্মদ তোহা ও শামসুল আরেফীন ইফতি মোশাররফসহ সবাইকে জানান, আবরার গ্রামের বাড়ি থেকে হলে এসেছে। এই খবর পাওয়ার পর সকলেই ২০১১ নম্বর কক্ষে আবার একত্রিত হন। রাত ৮টার দিকে মেহেদী হাসান ওরফে রবিন ও ইফতি মোশাররফের নির্দেশে এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম, মুনতাসির আল জেমি, এ এস এম নাজমুস সাদাত আবুজার মিলে আবরারের কক্ষে যান। আবরার তখন ঘুমাচ্ছিলেন। ঘুম থেকে জাগিয়ে ল্যাপটপ, মোবাইলসহ তারা আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। ঐ কক্ষে যাওয়ার পর তাবাখখারুল, ইফতি মোশাররফ ও মুজতবা রাফিদ চেক করতে থাকেন আবরারের মোবাইল-ল্যাপটপ। একজন বলেন, আবরারের মোবাইলে শিবিরের তথ্য পাওয়া গেছে, তখনই মেহেদী হাসান ওরফে রবিন ক্ষিপ্ত হন। আবরারকে তার চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলতে নির্দেশ দেন। আবরার চশমা খোলার পর মেহেদী হাসান ওরফে রবিন প্রচণ্ড জোরে তার মুখে কয়েকটি থাপ্পড় মারেন। এরই মধ্যে মোরশেদ অমর্ত্য ইসলাম কাঠের তৈরি শক্ত ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে আসেন। এরপর ইফতি মোশাররফ জোরে থাপ্পড় মারেন আবরারকে। হাতে তুলে নেন ক্রিকেট স্ট্যাম্প। এরপর আবরারের পিঠে, পায়ে, হাতেসহ বিভিন্ন স্থানে নির্মমভাবে আঘাত করতে থাকেন। প্রচণ্ড মারধরের কারণে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দুই টুকরা হয়ে যায়। তখন এহতেসামুল রাব্বি ও তানিম আরো একটি ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে আসেন। এরপর অনিক সরকার একটি স্টাম্প হাতে তুলে নেন। অনিক একাধারে আবরারের সারা শরীরে ৫০ থেকে ৬০টি আঘাত করেন। এতে আবরার মেঝেতে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে মুজাহিদুল ইসলাম ও শামিম বিল্লা স্কিপিং রোপ (মোটা দড়ি) দিয়ে আবরারকে দুই থেকে তিনটি আঘাত করেন। আবরার ফাহাদ তখন বাঁচার জন্য আকুতি-মিনতি করেন। কিন্তু তাতেও তার রক্ষা হয়নি। বরং মিফতাহুল ইসলাম ওরফে জীয়ন ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে আবরারের শরীরের বিভিন্ন স্থানে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। বারবার জানতে চান, আবরার শিবির করে কি না?
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রাত তখন এগারোটা। তখন ঐ কক্ষে এসে হাজির হন এস এম মাহমুদ ওরফে সেতু। আবরারের ব্যাপারে উপস্থিত অন্যদের কাছ থেকে তিনি জানতে চান। তখন অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ ও মুজাহিদুল ইসলাম জানান, ‘আবরার কোনো তথ্য দিচ্ছে না।’ তখন মাহমুদ ওরফে সেতু অন্যদের বলে যান, ‘মারতে থাক।’ এমন নির্দেশনার পর আবরারকে আবার ক্রিকেট স্ট্যাম্প, স্কিপিং রোপ দিয়ে মারা হয়।
আবার ইফতি মোশাররফ ও অনিক সরকার আবরারকে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে পেটাতে থাকেন। হাতের কনুই দিয়ে আবরারের পিঠে প্রচণ্ড আঘাত করেন। তখন সবাই মিলে প্রচণ্ড শক্তিতে আবরারকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি চড়-থাপ্পড় লাথি মারতে থাকেন। এরপর ঐ কক্ষ থেকে বের হওয়ার আগে অনিক সরকার ও মেহেদী হাসান ওরফে রবিন অন্যদের বলে যান, ‘তোরা আবরারের কাছ থেকে তথ্য বের কর।’ তখন মনিরুজ্জামান মনির বলেন, তিনি আবরারের মোবাইল ফোন চেক করে শিবিরের তথ্য পেয়েছেন। এরপর মনিরুজ্জামান ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে আবরারকে পেটাতে থাকেন। তাবাখখারুল, নাজমুস সাদাত, এহতেশামুল রাব্বী ওরফে তানিম, মুনতাসির আল জেমি আবরারকে চড়-থাপ্পড় মারেন। বাইরে থেকে আবার ঐ কক্ষে ঢোকেন অনিক সরকার। হাতে তুলে নেন ক্রিকেট স্টাম্প। তখন অনিক সরকার আবার আবরার ফাহাদকে প্রচণ্ড জোরে আরো ৪০ থেকে ৫০টি আঘাত করেন। তখন আবরার বমি ও প্রস্রাব করে ফেলেন। বাঁচার জন্য ইশারা-ইঙ্গিতে আকুতি-মিনতি করেন। এমন অবস্থায় আবরারকে হলের বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ধুয়ে মুছে আবরার ফাহাদের জামা-কাপড় বদলানো হয়।
এরপর ইফতি মোশাররফ ও মেহেদী হাসানের নির্দেশে নাজমুস সাদাত, শামীম বিল্লাহ, শামসুল আরেফিন, আকাশ, মোয়াজ আবু হোরায়রা, মুনতাসির আল জেমি ও এহতেশামুল রাব্বি আবরারকে ধরাধরি করে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। ইফতি মোশাররফ হলের মেস বয় জাহিদ হাসানকে ডেকে আনেন। ২০১১ নম্বর কক্ষটি তাকে দিয়ে পরিষ্কার করানো হয়। রাত আড়াইটার সময় ইফতি মোশাররফ, মুজাহিদ, তাবাখখারুল ও তোহা মিলে আবরারকে তোশকে করে হলের দোতলার সিঁড়িতে রাখেন। এরপর আসামিরা বুয়েটের চিকিত্সক ও অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আনেন। চিকিত্সক আবরারের দেহ পরীক্ষা করে ঘোষণা দেন তিনি মারা গেছেন।
