মনীষী

‘হক কথা’র মওলানা ভাসানী

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ২২:১৩

নিপীড়িত মানবতার অগ্নিপুরুষ সংগ্রামী জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তার সংগ্রামের প্রজ্বালিত মশাল হাতে নিয়ে আজীবন ছুটে বেড়িয়েছেন গ্রামবাংলার সাধারণ দুঃখী মানুষের ঘরে ঘরে—এদেশের কামার-কুমার-তাঁতি-জেলে-শ্রমিক-কৃষক—আপামর জনগণের হূদয়ের দ্বারপ্রান্তে।

মওলানা ভাসানীর জীবন-ইতিহাস আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস, সাফল্যে মুখোজ্জ্বল বিজয়ের ইতিহাস। অগণিত নির্যাতিত মানুষের মুক্তির ইতিহাস, বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ আর ঔপনিবেশিক শোষণের নাগপাশ থেকে চিরমুক্তির ইতিহাস। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশকে এই উপমহাদেশে অনন্য প্রতিভার অধিকারী যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ক্ষণজন্মা মনীষী নিঃস্ব-নির্যাতিত, সর্বহারা মানুষের দুঃখময় জীবনে বাঁচার সাধ এনে দিয়েছিলেন, মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন— তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন।

কিশোরকাল থেকে শুরু করে মৃত্যুকাল ১৭ নভেম্বর ১৯৭৬ পর্যন্ত প্রায় শতাব্দীকালব্যাপী অভাবী ও সর্বহারা মানুষের সেবায় আত্মনিয়োজিত, আত্মোত্স্বর্গকৃত এই মানুষটি শুধু রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অগণিত মানুষের ধর্মীয় গুরুপির, মুর্শিদ, মওলানা, হুজুর। সমাজের উচ্চস্তরের মানুষের কাছে তিনি যেমন ছিলেন অসীম শ্রদ্ধার পাত্র, নিম্নস্তরের মানুষের কাছেও তিনি ছিলেন তার চেয়েও অধিক শ্রদ্ধা ও ভক্তিপূর্ণ ভালোবাসার পাত্র; তাদের প্রাণের কাছাকাছি অতি আপনজন।

তিনি জীবনে ২৭ বার জেল খেটেছেন। জেলে মোট কাটিয়েছেন প্রায় ৩১ বছর। আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে ভাসানীকে জেলে পুরে দেন। একাধারে সাড়ে চার বছর তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখেন।

স্বাধীনতা-উত্তর কালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে দেশের একমাত্র বিরোধী দল ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। পার্থিব সম্পদের সকল প্রকার লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। সন্তোষের পর্ণকুটিরে দেশের শতকরা ৯০ জনের পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি বিরাট বিরাট নেতার সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে মোটেই কুণ্ঠাবোধ করতেন না। সহজ-সরল জীবনযাপনে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হতো না। মোনাফেকি তার জীবনে ছিল অনুপস্থিত।

তার ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ কিংবা জলোচ্ছ্বাসে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেই যে হুংকার ছেড়েছিলেন, ‘ওরা কেউ আসেনি’ বলে, সেই স্মরণীয় ঘটনা কেউ কোনো দিন ভুলতে পারবে না। মওলানা ভাসানী সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সত্, সাহসী ও নির্ভুল নেতৃত্বে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তা বাংলার মানুষকে শতাব্দীর পর শতাব্দী সাহস ও প্রেরণা জোগাবে।

কে আর সন্তোষের উদাম প্রান্তরে খড়ে ছাওয়া পর্ণকুটিরের জায়নামাজে ধ্যানমগ্ন হবেন আর চাবুক হাতে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসনবাদের বিরুদ্ধে হুংকার ছাড়বেন? কে আর মেঠো মানুষকে খাওয়াবে নৌকাভরা গরম খিচুড়ি? কে আর টিয়ারগ্যাস ও গরম পানি অগ্রাহ্য করে পড়াবে জানাজা শহিদদের? কার ডাকে মানুষ আবার জেলের তালা ভাঙার মতো উন্মাদনায় নৃত্য করবে?

শুধু রাজনীতি নিয়ে তিনি ব্যস্ত থাকেননি, রবুবিয়াত বা পালনবাদের ভিত্তিতে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-উপজাতি তথা জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের কল্যাণমুখী শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে উপযুক্ত কর্মীবাহিনী সৃষ্টির জন্য যুগোপযোগী আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার মডেল হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তার জীবনের সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

তার সম্পূর্ণ জীবন কেটেছে সংগ্রামে আর বিদ্রোহে। তার এই সংগ্রামী চরিত্র ও ঐতিহ্যের কারণে অনেকেই তাকে ‘ফায়ার ইটিং মওলানা, রেড মওলানা’, আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিন তাকে ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’ বিশেষণে আখ্যায়িত করেছে। তার সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা ছিল—তিনি জ্বালাও-পোড়াও নীতির সমর্থক। কিন্তু বিপ্লব ও সংগ্রাম ছাড়া স্বাধীনতা আসে না, এ কথা তার সমালোচকেরা বুঝতে চাইতেন না।

একাত্তরে দেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পাকিস্তানি হানদার বাহিনী মওলানার সন্তোষের বাড়িটি জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় তিনি ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকার ওপর অবস্থান করছিলেন। এপ্রিল মাসেই তিনি ভারত হয়ে লন্ডনে গিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিকল্পনা করেন। ১৯৭২-এর ২২ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরেই তিনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সাধ্যমত চেষ্টা করেন।

লেখক :সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক