মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে যেসব গাড়ি চলছে তার সবগুলোই এক একটি চলন্ত বোমা! ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলছিলেন ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ খান। তার মতে, অধিকাংশ গাড়ির মালিক নিয়মিত গ্যাসের সিলিন্ডার রিটেস্ট (পুনঃপরীক্ষা) করাচ্ছেন না। ফলে এগুলো বিস্ফোরিত হলে ক্ষতির পরিমাণ বোমা বিস্ফোরণের চেয়েও বেশি হবে।
একই কথা বলেছেন বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ এক একটি সিলিন্ডার একটি বোমার চেয়েও ভয়াবহ। এসব জেনেও আমরা গ্যাসের সিলিন্ডারটি নিয়মিত পরীক্ষা করছি না। মঝে মধ্যে আমরা যে রিপোর্ট পাই সেটা প্রাইভেটকারের। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা অন্যান্য যানবাহনের কোনো তথ্যই আমাদের কাছে নেই। ফলে তাদের অবস্থা কী আমরা কিছুই জানি না। একটি প্রাইভেট গাড়িতে মালিক নিজেই চলাচল করেন। তারপরও তিনি জেনে বুঝে নিয়মিত সিলিন্ডারটি পরীক্ষা করাচ্ছেন না। ফলে ঝুঁকিতে থাকছেন তিনি নিজেই। আমরা মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ সিএনজিচালিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় অতিক্রম করা গাড়ির সংখ্যা ৪ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই রয়েছে ২ লাখ। এগুলোর ৬০ থেকে ৭০ ভাগই পুনঃপরীক্ষা করা হয়নি। সিএনজি নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মান নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর রিটেস্টের বিধান রয়েছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার নিয়েই হাজার হাজার যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে। এর ফলে মাঝে মধ্যে গাড়িতে ঘটছে বিস্ফোরণ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে ২ শতাধিক গাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
সর্বশেষ গত সোমবার কুমিল্লায় একটি মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে শিশুসহ তিন জন নিহত হয়েছেন। মাঝে মধ্যেই এ ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনের দিকে এ সংখ্যা ভয়াবহভাবে বাড়তে পারে।
ঢাকা শহরে এখন ২ লাখেরও বেশি যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। এর যে কোনোটিতে যখন-তখন ঐ মাইক্রোবাসের মতো বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। হতাহত হতে পারেন যাত্রী-চালক যে কেউ। প্রতি পাঁচ বছরে অন্তত একবার গাড়িতে লাগানো গ্যাসের সিলিন্ডার পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরে এই পরীক্ষার তালিকা জমা দেওয়ার কথা। মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার গাড়ি নিয়মিত পরীক্ষা করায়। অন্যরা পরীক্ষা করে কি-না বা তাদের মেয়াদ আছে কি-না তার কিছুই জানে না বিস্ফোরক অধিদপ্তর।
শামসুল আলম বলেন, ‘প্রতি বছর গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার সময় গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য আমরা বছর দুয়েক আগে মন্ত্রণালয়কে লিখেছিলাম। তারাও বিষয়টি আন্তরিকভাবে নিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হলো দেশে মাত্র ৩০/৩২টি রিটেস্ট (পুনঃপরীক্ষা) সেন্টার আছে। ফলে এটি আইনের মধ্যে ঢুকালে ঐ রিটেস্ট সেন্টারগুলোতে এমন চাপ পড়বে তখন একটা লেজেগোবরে অবস্থা হয়ে যাবে। এ কারণ তখন আইনের মধ্যে বিষয়টি ঢোকানো হয়নি। ফলে গাড়ির মালিকরা ইচ্ছেমতো হয় পরীক্ষা করাচ্ছেন, নতুবা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। আর আইনের মধ্যে কিছু না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।
কয়েকদিন আগে রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কে বেলুনে গ্যাস ভরে বিক্রি করার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ গ্যাস বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদের বিরুদ্ধে রূপনগর থানায় মামলা করেছে। বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত হন আবু সাঈদও। এ ঘটনার পর বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস নিষিদ্ধ করছে সরকার।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ খান বলেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩ হাজার পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় চলাচলকারী এক একটি গাড়ি যেন চলমান বোমা হয়ে ওঠে। গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার এমনকি গ্যাসও উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডার যথাযথ না হলে বড়ো রকমের অঘটন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। বড়ো বাস-ট্রাকের বিস্ফোরণের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ বাস-ট্রাকগুলোতে ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে।
এর বাইরে বাসা-বাড়িতে যে গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয় সেগুলোরও একই অবস্থা। তবে ঐসব সিলিন্ডারে গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিস্ফোরণের ঝুঁকি কম। তবে নিয়মিত পরীক্ষা না করালে লিকেজ থেকে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। যেটা প্রায়ই ঘটছে। এ সিলিন্ডারগুলোরও এখনই নিয়মের মধ্যে আনা দরকার।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ। যদিও এ হিসাব স্বাধীনতার পর থেকে। এর বাইরে অনিবন্ধিত অনেক গাড়িও আছে। আবার বহু গাড়ি এখন আর রাস্তায় চলে না। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা ৩০ থেকে ৩২ লাখ। বিআরটিএর এক জন প্রকৌশলী জানান, গ্যাস সিলিন্ডারগুলো ঝুঁকিপূর্ণ কি-না তা পরীক্ষা করা হয় প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সারাদেশে এমন ৬৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রিটেস্ট সেন্টার আছে মাত্র ৩২টি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন করে যদি বিআরটিএর ফিটনেস নেওয়ার সময় সিলিন্ডার রিটেস্ট করানো বাধ্যতামূলক করা যায় তাহলে এ ধরনের ঝুঁকি কমবে। সবাই সচেতন হবে। ফলে প্রাণহানি কমবে ও যানবাহনও নিরাপদ হবে।
