ফোক ফেস্টের শেষ দিন বলেই হয়তো চমকের পর চমক ছিল। রাশিয়ার ব্যান্ড দল সাত্তুমা বিশ্বজুড়েই আলোড়ন তুলেছে। সেই জনপ্রিয়তার ঢেউ গতকাল আছড়ে পড়লো আর্মি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। সাত্তুমার নিউ ফোকের যে দোলা তার সঙ্গে বিরোধ নেই বাংলাদেশের গানের পাখি চন্দনা মজুমদারের বাউল গানের। বাংলার লোকসংগীতে যেমন মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেমের কথা তেমনি সাত্তুমার গান বা সুরশৈলীতেও সেই সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, লড়াই ও কষ্টের বর্ণনা উঠে আসে।
চট্টগ্রামের আব্দুল মালেক কাওয়াল সুফি ধারার ভক্তিমূলক গানে মহান আল্লাহর বন্দনা করলেন। তার সেই স্রষ্টার প্রতি নিবেদনের সঙ্গে দূরত্ব নেই পাকিস্তানের সুফি ধারার ব্যান্ড দল জুনুনের পরিবেশনার। ভাষা, গায়কির ভিন্নতা থাকলেও সুরের প্রতি শিল্পীদের নিবেদন শ্রোতাদের এক পথে মিলিয়ে নেয়। ভাষা, প্রকাশের ভিন্নতা থাকলেও তা হয়ে ওঠে মানুষের কথা, ভালোবাসার কথা, জীবনের কথা। সংগীত দেশের ফারাক ঘুচিয়ে সবাইকে বিশ্ব নাগরিক করে তোলে। সারাবিশ্বের লোকগানে উঠে আসে মানুষের আনন্দ-বেদনার কাব্য।
গতকাল শনিবার মেরিল নিবেদিত সা ফাউন্ডেশন আয়োজিত পঞ্চম আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সবের ছিল শেষ দিন। শেষ দিনেও কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল আর্মি স্টেডিয়াম। কাওয়ালি সুফিধারার ভক্তিমূলক সংগীত বা আধ্যাত্মিক সংগীত যা স্রষ্টার প্রতি নিবেদিত। বাংলাদেশের এ সময়ের স্বনামধন্য আব্দুল মালেক কাওয়াল ও তার দল কণ্ঠমাধুর্যে স্রষ্টার প্রতি সেই কৃতজ্ঞতাই জ্ঞাপন করলেন। কাওয়ালি গানের প্রবর্তক ছিলেন বিখ্যাত কবি আমীর খসরু। ফারসি ও উর্দু ভাষায় এই গান মুসলমানরাই গেয়ে থাকেন। তিনি প্রথমেই গেয়ে শোনান ‘ইয়ে রাসুলে খোদাকো ভুল গ্যায়ে’। এরপর তিনি গেয়ে শোনান ‘বড়ো বাবা মওলানা’। ততক্ষণে আর্মি স্টেডিয়াম কানায় কানায় পরিপূর্ণ। চার দশকের বেশি সময় ধরে কাওয়ালি গান গেয়ে আসছেন আব্দুল মালেক। তার হাতেখড়ি গুরু মহীন কাওয়ালের কাছে। পরবর্তীতে ওস্তাদ টুনু কাওয়ালের কাছে তালিম নেন। তৃতীয় গান তিনি পরিবেশন করেন ‘মওলানা মওলানা’।
গতকাল দিনের সেরা দল ছিল রাশিয়ার সাত্তুমা ব্যান্ড। সাত্তুমা অর্থ গন্তব্যে পৌঁছানো। গানে গানে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে চায় তারা। এই দলটি একটি পারিবারিক দল, বাবা ও সন্তানদের নিয়ে গড়া এ দলটি নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে এক অদ্ভুত সুরের মূর্ছনায় ভাসালেন শ্রোতাদের। দলটি রাশিয়ান, ফিনিশ ও ক্যারেলিয়ান ভাষায় গান গেয়ে থাকে। গতকাল আর্মি স্টেডিয়ামের মঞ্চেও তারা গেয়ে শোনালেন তাদের গান। দলটির বাদ্যযন্ত্র যেমন স্থানীয় তেমনি তারা স্থানীয় ভাষার ব্যবহার করে থাকে তাদের গানে।
সাত্তুমার পরে মঞ্চে আসেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী চন্দনা মজুমদার। তিনি মূলত লালন শিল্পী। তবে লালনের পাশাপাশি তিনি রাধারমন, হাসন রাজা, শাহ্ আবদুল করিমসহ অন্য লোকশিল্পীদের গান গেয়ে থাকেন। গতকাল উত্সব মঞ্চে গান গেয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন তিনি।
জুনুন এই উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের প্রিয় একটি নাম। সুফি ঘরানার গান দিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছে ব্যান্ডটি। গতকাল তারা পরিবেশনার জন্য নির্বাচন করেছিলেন সুফি রক ও ফিউশনধর্মী কিছু গান। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত জুনুনের চতুর্থ অ্যালবাম ‘আজাদি’ উপমহাদেশজুড়ে ঝড় তুলেছিল। অ্যালবামের প্রথম গান ‘সাইওনি’ পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ—তিন দেশের শ্রোতার কাছেই তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। জুনুনের পরিবেশনার মধ্য দিয়েই পর্দা নামে তিন দিনের বর্ণিল ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সবের।
