চট্টগ্রামে একটি পাঁচ তলা ভবনের নিচের তলায় বিস্ফোরণে দেওয়াল ধসে পথচারী নারী ও শিশুসহ সাত জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার সকাল পৌনে ৯টায় নগরীর পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের বড়ুয়া ভবনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে ঐ ভবনের নিচের তলার দুটি দেওয়াল ও সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে। এছাড়া বিপরীত দিকের একটি ভবনের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। আশপাশের কয়েকটি দোকানের সামনের শাটার, শোকেসসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিস্ফোরণের সময় রাস্তা দিয়ে যাওয়া দুটি রিকশা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিস ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
গ্যাসলাইনে লিকেজ না কি সেপটিক ট্যাংক থেকে বিস্ফোরণ, কিংবা নাশকতা থেকে এ বিস্ফোরণ কি না সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত নয় কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসন ও মহানগর পুলিশের পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ছয় জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন পটিয়ার মেহেরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়ুয়া, রং মিস্ত্রি নুরুল ইসলাম, ভ্যানচালক মো. সেলিম, রিকশাচালক আবদুস শুকুর, গৃহবধূ জুলেখা খানম ফরজানা ও তার আট বছর বয়সি ছেলে আতিকুর রহমান। ভবনের নিচতলার বাসায় থাকতেন সন্ধ্যা রানী নাথ ও তার বোনের মেয়ে অর্পিতা নাথ। তারা দুজনেই চট্টগ্রাম মেডিক্যালে চিকিত্সাধীন। সিএমপির উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান ঘটনাস্থলে ইত্তেফাককে বলেন, সকাল পৌনে ৯টার দিকে হঠাত্ বিকট শব্দে বড়ুয়া ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় কর্মব্যস্ত লোকজন যে যার কাজে যাচ্ছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিস্ফোরণে চূর্ণ-বিচূর্ণ দেওয়াল, ভাঙা ইটের টুকরা ও লোহার রড গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের মতো পথচারীদের শরীরে গিয়ে আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় পাঁচ জন। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সহায়তায় হতাহত মোট ১৭ জনকে আমরা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছি। এর আগে স্থানীয় বাসিন্দারাও ধরাধরি করে কয়েকজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর আরো দুই জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানতে পেরেছি।
বিস্ফোরণের সঠিক কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ তাত্ক্ষণিক কিছু জানাতে পারেনি। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক জসীম উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্ফোরণের কারণ বলা যাবে না। গ্যাসলাইন পুরোনো ছিল। সেখানে লিকেজের কারণে বিস্ফোরণ হতে পারে। আবার নাশকতা বা কেমিক্যাল থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহসিন ইত্তেফাককে বলেন, গ্যাসলাইনের রাইজার বিস্ফোরণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। তদন্ত করে আসল কারণ জানা যাবে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইসমাইল হোসেন বালি জানান, লাইনে লিকেজ ছিল অথবা রান্নাঘরের চুলা সারারাত খোলা ছিল। এতে সারা ঘরে গ্যাস জমে বোমার মতো হয়ে যায়। সকালে রান্নার জন্য চুলা জ্বালাতে গিয়েই বিকট শব্দে তা বিস্ফোরণ হয়। গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণের কথা সাংবাদিকদের কাছে অস্বীকার করেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের একটি টিম। তবে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী সারওয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, গ্যাসের রাইজার ও পাইপলাইন অক্ষত অবস্থায় আছে। নিচ তলায় রান্না ঘরের পাশে আরেকটি রুম রয়েছে। সেই রুমের একটি অংশে সেপটিক ট্যাংক ছিল। সেই ঘরে বিস্ফোরণ ঘটেছে। রাইজার পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে। সিডিএর প্রধান পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম খান বলেন, ভবনটি বিধি অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। সড়কের জায়গা দখল করে ভবনের সামনের অংশ বাড়ানো হয়েছে। সেপটিক ট্যাংক করা হয়েছে সড়কের পাশে। নিয়ম অনুসারে ডিজাইন না হলে সেপটিক ট্যাংকে গ্যাস জমে। সেপটিক ট্যাংকের পাশে কিচেন ও গ্যাস রাইজার। প্রাথমিক তদন্তে আমরা এসব বিষয় চিহ্নিত করেছি।
ইকবাল নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী যুবক ইত্তেফাককে বলেন, ‘এক ভয়ংকর দৃশ্য দেখেছি, যা জীবনেও ভুলব না। দেখলাম ভাঙা দেওয়ালের বড়ো বড়ো টুকরা উড়ে গিয়ে পথচারীদের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করছে। মাথায় আঘাত লাগাদের অধিকাংশই ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। বিস্ফোরণের পরপরই আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। সবাই ধরাধরি করে হতাহতদের পিকআপ ভ্যান, অটোরিকশাসহ বিভিন্নভাবে চমেক হাসপাতালে পাঠাই।’ বড়ুয়া ভবনের বিপরীত দিকের জনতা ফার্মেসির মালিক যীশু নাথ বলেন, ‘আমার কর্মচারী দোকান খুলছিল। আমি একটু দূরে ছিলাম। হঠাত্ দেখি সামনের বিল্ডিংয়ের দেওয়াল উড়ে গিয়ে আমার দোকানের মধ্যে পড়েছে। দুজন মহিলা রিকশা দিয়ে যাচ্ছিলেন। উড়ে আসা দেওয়ালের ধাক্কায় তারা আমার দোকানের এসে পড়েন। সেখানেই তারা মারা যান।’
এদিকে, বিস্ফোরণে হতাহতের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান, জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন ও নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন। মেয়র নিহতদের পরিবারপিছু ১ লাখ টাকা অর্থ সহায়তা ও আহতদের চিকিত্সার ব্যয়ভার বহনের ঘোষণা দেন। জেলা প্রশাসক পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করার কথা সাংবাদিকদের জানান। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ জে এম শরিফুল হাসান এই কমিটির প্র্রধান। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেবেন উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান।
