এমপি সরকারি কর্মকর্তাসহ ১৪৮ জনের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে দুদক

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৪২

ক্যাসিনো ব্যবসার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে বর্তমান এমপি ও সরকারি কর্মকর্তাসহ ১৪৮ জনের ব্যাংক হিসাব তলব করে খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই ধারাবাহিকতায় দুদক দুই দফায় বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে ওইসব ব্যক্তির ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য তলব করেছে কমিশন। এর মধ্যে গত রবিবার জাতীয় সংসদের বর্তমান তিন এমপি, গণপূর্তের ১৭ প্রকৌশলী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমসের পাঁচ কর্মকর্তাসহ ১০৫ জনের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে কমিশন। আর গত ২৮ অক্টোবর দুদক বিএফআইউ-এর কাছে ৪৩ ব্যক্তির ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য তলব করে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, ক্যাসিনোয় জড়িতদের অবৈধ সম্পদের অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুদক। এরই ধারাবাহিকতায় দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যটালিয়নের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর মহাপরিচালকের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন দুদক চেয়ারম্যান। এরপর র্যাব এবং বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীতে ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত কমিশনকে দেয়। অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে দুদক থেকে গত রবিবার ও ২৮ অক্টোবর দুদক থেকে বিএফআইউ প্রধান বরাবর দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিগুলোতে প্রত্যেকের নাম, ঠিকানা ও পদবি উল্লেখ করে তাদের সব তথ্য চাওয়া হয়েছে। এই তালিকায় থাকা দেশড় জনের মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকার পাশাপাশি চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন উপায়ে অবৈধ সম্পদ অর্জন করা অভিযোগ রয়েছে। ওই নোটিশের পর দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত জানান, কমিশন ইতিমধ্যে ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ৪৩ জনের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাদের সম্পদের বিবরণী নেওয়া হচ্ছে। তাদের শিগিগরই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি আরো বলেন, তদন্তে যদি তাদের সম্পদের আয়ের উত্স সঠিকভাবে না পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা এবং মানি লন্ডারিংয়ের মামলা হবে।

ক্যাসিনো ব্যবসার অনুসন্ধানের স্বার্থে যাদের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে তিন এমপি হলেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান এমপি পঙ্কজ দেব নাথ, বর্তমান এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ও জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী এমপি। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার, এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের স্ত্রী ফারজানা চৌধুরী, ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাশেদুল হক ভূঁইয়া, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বাতেনুল হক ভূঁইয়া, মো. জহুর আলম, হারুনুর রশিদ, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা মোমিনুল হক, ঢাকা দক্ষিণের ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ওরফে ম্যাজিক রতন, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক ওরফে মঞ্জু, যুবলীগ দক্ষিণের সহসভাপতি সারোয়ার হোসেন ওরফে মনা, যুগ্ম-সম্পাদক সোহরাব হোসেন, নির্বাহী সদস্য মিজানুর রহমান, ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি এস এম রবিউল ইসলাম, যুবলীগ নাখালপাড়া-তেজগাঁও শাখার কাজল, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি তাবিবুল হক, শাহেদুল হক, তার স্ত্রী সারিনা তামান্না হক, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদ্য সাবেক নেতা কে এম মাসুদুর রহমান, তার স্ত্রী লুত্ফুন্নাহার লুনা, বাবা আবুল খায়ের খান, মা রাজিয়া খান, যুবলীগ দক্ষিণের সহসভাপতি মুরসালিক আহমেদ, তার স্ত্রী কাওসারী আজাদ, বাবা আব্দুল লতিফ, মা আছিয়া বেগম, বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা কামরান প্রিন্স মোহাব্বত, যুবলীগের আকিয়ার রহমান, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান হোসেন খান, কেন্দ্রীয় সদস্য হেলাল আকবর চৌধুরী, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক তসলিম উদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক কায়সার আহমেদ, যুবলীগ উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক তাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং যুবলীগের গাজী সারোয়ার।

দেশের বাইরে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও নাদিম, মেসার্স জামাল অ্যান্ড কোম্পানির ঠিকাদার জামাল হোসেন, জি কে শামীমের স্ত্রী শামীমা সুলতানা, সহযোগী জিয়া, নাঈম, শেখ মাহাম্মুদ জুনায়েদ, এস এম আজমুল হোসেন ও ব্রজ গোপাল হালদারের হিসাব চাওয়া হয়েছে।

অপর দিকে বান্দরবানের সিলভান ওয়াই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা সেন্টারের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন, এমডি ফজলুল করিম চৌধুরী, পরিচালক এম মহসিন, উম্মে হাবিবা নাসিমা আক্তার, জিয়া উদ্দিন আবীর, জাওয়াদ উদ্দিন, বনানী গোল্ড ক্লাবের আব্দুল আওয়াল, আবুল কাশেম, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফিন্যান্সের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার হালদার, শরফুল আওয়াল, পদ্মা অ্যাসোসিয়েটস ইঞ্জিনিয়ার্সের ঠিকাদার মিনারুল চাকলাদার, সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মুজিবুর রহমান, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের ঠিকাদার রেজোয়ান মোস্তাফিজ, মগবাজার টিঅ্যান্ডটি কলোনির জাকির, নয়াটোলার সেন্টু, শোভন, বাড্ডার নাসির, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের আবুল কালাম, শিক্ষা অধিদপ্তরের ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম, ঢাবি এফ রহমান হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানের হিসাব চাওয়া হয়েছে।

এছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকায় রয়েছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন, রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উত্পল কুমার দে, আব্দুল হাই, হাফিজুর রহমান মুন্সী, নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক মধু, শওকত উল্লাহ, ফজলুল হক, রোকন উদ্দিন, আফসার উদ্দিন, স্বপন চাকমা, ইলিয়াস আহমেদ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মোমিন চৌধুরী, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার সিনিয়র সহকারী প্রধান মুমিতুর রহমান, সাজ্জাদ, উপসহকারী প্রকৌশলী আলী আকবর সরকার, কমলাপুর আইসিডির কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত কমিশনার মো. মাহমুদুল হাসান, সহকারী কমিশনার কানিজ ফারহানা, আবুল কাশেম, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিনুল হক।

মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে যাদের ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে, তারা হলেন—ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া, এনামুল হক আরমান, জি কে শামীম, শামীমের মা আয়েশা আক্তার, গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক, যুগ্ম-সম্পাদক রূপন ভুঁইয়া, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি ও কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম, যুবলীগের বহিষ্কৃত দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান, তারেকুজ্জামান রাজীব, মিজানুর রহমান, মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভুঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সেলিম প্রধান ও যুবলীগের নির্বাহী সদস্য জাকির হোসেন।