মূল্যবোধ গঠন হোক, জীবনযাত্রা সুন্দর হোক

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩২

আলোকপাত

নিখিলেশ ঘোষ

আমাদের বোধ ও বোধের, মন ও মননের পরিচয় ও প্রকাশ কোথায়? সভ্যতার এই পর্যায়ে এসেও কেন আমাদের পরিচয় অসভ্য, বর্বরতার? কেন আমাদের মধ্যে আলোর প্রতিসরণ দেখছি না? কেন মনুষ্যত্বের এমন পরাজয়? কেন এই অন্ধ বিদ্বেষ? কেন বিবেক বারবার পরাজিত হবে? কেন মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ হবে?—এই আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি। আমাদের সম্মিলিত পাপ ও ভুলের মাশুল কি দিচ্ছে অবুঝ শিশুরা? এমন প্রশ্ন থেকে থেকেই মনে উঁকি দিচ্ছে। কোনো উত্তর পাচ্ছি না। শিশুরা সভ্যতার ফুল; এই ফুলকে আমরা নির্দ্বিধায় দলিত করছি তুচ্ছ কারণে। রাগ-অভিমানেও শিশুদের জীবন হরণ করছি। সুন্দরের প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণ আছে। কিন্তু সুন্দরের প্রতীক শিশুদের প্রতি কেন এমন নির্দয় হচ্ছি? নিষ্পাপ শিশুরা হচ্ছে পদদলিত!

বর্তমান বিশ্বে মানুষের আচরণের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সহজাত প্রবৃত্তিরও ঘটেছে রূপান্তর। অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ ও সুশৃঙ্খল পরিবারের সন্তানেরাও নানা ধরনের কুপ্রবৃত্তিতে মেতে উঠছে পারিবারিকভাবে। নীতি-আদর্শ লালন করে আসা ব্যক্তিরাও কূপমন্ডুকতা ও সংস্কারের বিশ্বাস থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। কারণ স্মার্টফোন ও ব্রডব্যান্ড প্রযুক্তির আধুনিক ছোঁয়ায় মানুষ বিশ্রামের সময় হারিয়েছে, হারিয়েছে জীবনের প্রশান্তি ও স্নিগ্ধতা। এতে মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে দুশ্চিন্তা ও হতাশা। এতে তার আচরণেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সন্ত্রাস, হানাহানি, নৈরাজ্য মানব ইতিহাসের চিরায়ত সত্য এবং চলমান ঘটনা। সঙ্গী, বাসস্থান ও খাবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ আয়ত্তে আনা এবং তা ধরে রাখার জন্যই এই নেতিবাচক আচরণ করে থাকে মানুষ। আবার কেউ কেউ ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, শ্রমিক নির্যাতন প্রভৃতি অপরাধে এবং অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অতিমাত্রায় লিপ্ত থাকে। মানুষের জীবনে সামাজিক অপরাধ ক্রমাগত বাড়ছে। ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে হরহামেশাই। বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যেও নানা হানাহানি ও অবিশ্বাস। বর্তমান সময়ে অন্যের সমালোচনা করা প্রায় প্রতিটি মানুষের এক সহজাত স্বভাব হয়ে উঠেছে।

জীবনের পথে আমরা দেখতে পাই যারা খারাপ প্রকৃতির মানুষ, তারা সাধারণত অত্যন্ত চালাক হয়ে থাকে। এতটাই ধূর্ত যে প্রায়ই নিজের খারাপ দিকগুলো আড়াল করে রাখে সেই চালাকির পেছনে। আজ যে মানুষ অন্যের ক্ষতি করল, কাল সে আরেকজনেরও ক্ষতি করতে পারে—এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না। ‘উত্তম চলে নিশ্চিন্তে অধমের সঙ্গে, যিনি মধ্যম, তিনি চলেন তফাতে।

উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, মানুষ তাদের কাজের সময় দায়িত্ব পালন করা নিয়ে ব্যস্ত থাকে বেশি। কারো পেছনে লাগার সময় তাদের নেই। কে কতটা পেশাদারি মনোভাব নিয়ে কাজ করবে, সেটাই হলো সেখানকার দক্ষতা প্রদর্শনের বড়ো কথা। তারা পরনিন্দা-পরচর্চায় সময় ব্যয় করে না বলেই ঐ দেশগুলো আজ উন্নত। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই হিংসা-বিদ্বেষ, মানুষে মানুষে রেষারেষি, হীন মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে। মনে রাখতে হবে, ক্রমাগত বদভ্যাস লালন করাটাই বদভ্যাস তৈরির প্রধান কারণ। মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অবাধ্যতা, সত্যিকারের ঝুঁকি বুঝতে না পারা এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আসক্তির কারণেই জন্ম হয় বদভ্যাসের। মানুষের মধ্যে বিদ্যমান কিছু খারাপ জিনই এর জন্য দায়ী। মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা খারাপ স্বভাবই তার আচরণে প্রকাশ পায়। এজন্য আমাদের আচরণ পালটাতে হবে।

মানুষের মূল্যবোধ গঠিত হোক, মানবিকতা বৃদ্ধি পাক, শুভবোধের উদয় হোক, জীবনযাত্রা সুন্দর হোক—এই প্রত্যাশা করি।

n লেখক : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা