‘দেশে নাকি লবণ নেই? দুয়েক দিন পর নাকি হাজার টাকা দিয়েও লবণ পাওয়া যাবে না!’ এমন ‘নাকি’র ওপর ভর করে দেশ জুড়ে লবণ নিয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে গেল গতকাল মঙ্গলবার। খাবার তৈরিতে অবশ্য প্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কেনার হিড়িক পড়ে যায় গুজব ছড়ানোর পর। লবণ পাওয়া যাবে না এমন কথা কোথায় শুনেছেন, এ প্রশ্নে সবারই উত্তর—লোকে বলাবলি করছে। অর্থাত্ শোনা কথায় কান দিয়ে বাস্তবতার ধারেকাছে না গিয়ে বহু লোকে ছুটেছেন লবণ কেনার জন্য।
সোমবার বিকালের পর গুজবের শুরুটা হয়েছিল সিলেট থেকে। এরপর সেখানকার এক শ্রেণির অসাধু চক্র অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রি করে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। দাম উঠিয়ে ছাড়ে প্রতিকেজি ১২০ টাকা পর্যন্ত। এরপর গতকাল কোথাও ৫০ কোথাও ১০০ আবার কোথাও ১২০ টাকা দরে বিক্রি হতে থাকে মাত্র ৩৫ টাকার লবণ। তবে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে অনেক স্থানেই দুুপুরের পর দোকানিরা ৩৫ টাকায় লবণ বিক্রি করেন। প্যাকেটের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি, বেশি মুনাফা করার অসত্ উদ্দেশে লবণ মজুত ইত্যাদি অভিযোগে দেশ জুড়ে হাজার হাজার ব্যবসায়ী ও দোকানদারের নিকট থেকে লাখ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। কোনো কোনো দোকানদার মওকা বুঝে বেশি দামে মাত্র দুয়েক কেজি বিক্রি করার পরই ধরা পড়ে যান মোবাইল কোর্টের হাতে। হয়তো ২০০ টাকা লাভ করে জরিমানা গুনতে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। তখনই তারা বুঝতে পেরেছেন ‘অতি লোভে তাতি নষ্ট’। এছাড়া অর্ধশতাধিক লোককে আটকও করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। সারাদেশ থেকেই ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা ‘লবণকাণ্ডের’ এই চিত্র তুলে ধরেছে।
তবে গুজবে কান দিয়ে বেশি দামে বেশি লবণ কিনে এখন শত শত লোক আফসোস করছেন। অনেকে লজ্জায় পড়ে বিদ্রুপের ভয়ে চুপ করে আছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট নগরীর এক বাসিন্দা জানান, তিনি সোমবার সন্ধ্যায় প্রতি কেজি ১২০ টাকা করে ১১ কেজি লবণ কিনতে পেরে ঈদে বাড়ি যাবার টিকিট পাবার মতো ‘সৌভাগ্যবান’ মনে করেছিলেন। কিন্তু গতকাল গুজব স্তিমিত হবার পর যখন আবার ৩৫ টাকা কেজিতে লবণ বিক্রি হতে শুরু করে তখন নিজের নির্বুদ্ধিতায় লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা পাচ্ছেন না। এভাবে ঠকে যাবার কথা কাউকে বলতেও পারছেন না। একইভাবে সারাদেশের জেলা-উপজেলা ছাপিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের গৃহস্থরাও লবণাতঙ্কের শিকার হন। তাদের কেউ আসল দামে পেয়ে বেশি করে কিনেছেন, কেউ বা ৪০/৫০ টাকা বাড়তি দাম দিয়েও ১০/২০ কেজি কিনে ঘরে নিয়ে গেছেন। অনেক ব্যবসায়ী আবার বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বস্তা বস্তা লবণ কিনে দোকানে নিয়ে গেছেন ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হবার আশায়। তবে দিন শেষে সবাই বুঝতে পেরেছেন, তারা প্রতারকদের গুজবে কান দিয়ে ধোঁকা খেয়েছেন।
জানা গেছে, পেঁয়াজ আতঙ্ক তৈরি হবার পর দাম হুহু করে বাড়ার ফলে মানুষ যে দুর্ভোগের শিকার হয়েছিল সেটি এবার আর হতে দিতে চায়নি প্রশাসন। দ্রুতগতিতে মানুষকে সচেতন করার জন্য কোথাও মাইকিং করা হয়, কোথাও লিফলেট বিলি করা হয় আবার তাতে কাজ না হলে বড়ো অঙ্কের জরিমানা করা হয়। ফলে সন্ধ্যার মধ্যেই বেশির ভাগ জেলায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।
