নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনসহ ১০ দফা দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় গতকাল মঙ্গলবারও পরিবহন ধর্মঘট পালিত হয়েছে। গতকাল দেশের ১০টি জেলায় চলাচল করেনি বাস। আর এ কারণে ঐ জেলাগুলোতে যাত্রীদের ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়। রেল স্টেশনে যাত্রীদের তীব্র চাপ বাড়ে। খুলনার পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে বলেছেন, আজ বুধবার থেকে বাস চলাচল শুরু হবে।
আমাদের অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
খুলনায় গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো বাসচালকেরা কর্মবিরতি পালন করেন। সকালে স্থানীয় সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে মধ্যস্থতার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা চলমান পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন। আজ বুধবার থেকে খুলনায় বাস চলাচল শুরু হবে বলে পরিবহন শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন।
গতকাল সকালে খুলনার সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার কোনো যানবাহন ছেড়ে যায়নি। এই সুযোগে মাহিন্দ্র, মিনি পিকআপ, মাইক্রোবাসসহ ছোটো গাড়িগুলোতে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে হয়। গতকাল নগরীর সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল ও রয়্যালের মোড়ে বাসগুলোকে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। জেলা বাস-মিনিবাস ও কোচ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সোনা বলেন, খুলনা থেকে সব রুটেই বাস চলাচল বন্ধ। খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বিপ্লব বলেন, নতুন সড়ক আইনের কিছু ধারায় মালিক ও চালকদের কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এ কারণে চালক ও মালিকেরা ভয়ে গাড়ি বের করেননি। খুলনায় গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত হলেও সমস্যা হলো অন্যান্য জেলার শ্রমিকদের নিয়ে।
গতকাল পিরোজপুর থেকে বাগেরহাট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও বেনাপোল রুটে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ ছিল। বিকালে ঢাকাগামী দূরপাল্লার পরিবহন চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। এছাড়া বাস ধর্মঘটের বিষয়টি আগে থেকে জানতে না পারায় ভোগান্তি বাড়ে যাত্রীদের। অনেকেই বাধ্য হয়ে পাঁচ-ছয় গুণ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মাহেন্দ্র, ইজিবাইক, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যে যান।
সকালে পাবনা থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল আংশিক বন্ধ ছিল। বেলা ৩টার দিকে পাবনার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কর্মবিরতি উপেক্ষা করে চালক-শ্রমিকদের একটি অংশ বাস চালাচ্ছে। তবে যারা বাস চালাচ্ছেন, তাদের বাধা দেন কর্মবিরতি পালন করা চালক-শ্রমিকেরা। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয় চালক-শ্রমিকদের মধ্যে।
মাগুরা-যশোর ভায়া আড়পাড়া সড়ক এবং মাগুরা-ঝিনাইদহ সড়কে অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল বন্ধ ছিল। এ কারণে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগ পোহায়। সাতক্ষীরার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে সকাল থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। বন্ধ ছিল অভ্যন্তরীণ রুটের সব বাস চলাচলও। তবে যাত্রীবাহী বাস বন্ধ থাকলেও দুই-একটি বিআরটিসি বাস চলাচল করতে দেখা গেছে।
সাতক্ষীরা বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান জানান, ২১ ও ২২ নভেম্বর শ্রমিকদের নিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রমিক ফেডারেশন মতবিনিময় করে সরকারের কাছে দাবি পেশ করবে। সরকারের কাছ থেকে আইন সংশোধনের আশ্বাস পেলে শ্রমিকেরা সড়কে ফিরে যাবেন বলে তিনি আরো জানান,
নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনে জেল-জরিমানার ভয়ে বাস চলাচল বন্ধ রাখেন বরিশালের পরিবহন শ্রমিকেরা। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই গতকাল সকাল ১০টা থেকে বরিশালের অভ্যন্তরীণ সব এবং দূরপাল্লার আংশিক রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকেরা।
সকালে ময়মনসিংহ-ঢাকাসহ দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ করে দেন ময়মনসিংহের চালক ও শ্রমিকেরা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ময়মনসিংহের আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মাসকান্দা থেকে সকালে চার-পাঁচটি বাস ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেলে গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে তারা বাধার সম্মুখীন হয়। এরপর থেকে চালক ও শ্রমিকেরা দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ করে দেন। এরপর অভ্যন্তরীণ সড়কেও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিকালের দিকে সব রুটেই কিছু কিছু বাস চলাচল আবার শুরু করে।
সকালে বেনাপোল থেকে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ভারত থেকে ফিরে আসা যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়। ঢাকা ও খুলনা রুটে ট্রেন সার্ভিস চলাচল করায় যাত্রীরা ট্রেনে চড়ে গন্তব্যে যান। তবে বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল।
রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশের বাস চলাচল স্বাভাবিক হলেও সড়কে কম বাস চলাচল করে গতকাল। এদিকে সড়ক-মহাসড়কে চলাচলরত মাদকাসক্ত চালকদের শনাক্ত করতে পবা হাইওয়ে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন পবা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা।
সকালে মাদারীপুর থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে গেলেও সকাল ১০টার পর থেকে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত ছাড়াই নওগাঁয় বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকেরা নিজ উদ্যোগে এই কর্মবিরতি পালন করেন বলে জানা গেছে। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে রংপুর জেলার সব ট্রাকচালক ও শ্রমিকেরা নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। টাঙ্গাইলে ব্যাপক অর্থে পরিবহন ধর্মঘট হয়নি। তবে যান চলাচল ছিল কম। ভূঞাপুরে শ্রমিকেরা দ্বিতীয় দিনের মতো ধর্মঘট পালন করেছেন। কোটালীপাড়া-রাজৈর সড়কে বাস চলাচল বন্ধ ছিল গতকাল।
