কুষ্টিয়া রেজিস্ট্রি অফিস

বন্ধ হয়ে আছে দলিল রেজিস্ট্রি!

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ২১:২৫

গত ৭ নভেম্বর ঘুষের লক্ষাধিক টাকাসহ দুদক টিমের হাতে সাব-রেজিস্ট্রার ও অফিস সহকারী গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে জমি রেজিস্ট্রি ও নকল উত্তোলনসহ সব ধরনের সেবা রয়েছে একেবারে বন্ধ। ফলে নিত্যদিনের জনদুর্ভোগসহ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র। এই সিন্ডিকেট চক্রটি দীর্ঘকাল যাবত্ দলিলপ্রতি হাতিয়ে নিচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। জমি রেজিস্ট্রিতে সরকার নির্ধারিত ‘পেঅর্ডার/ফি’ ছাড়াও সেবাগ্রহিতাদের বাড়তি দিতে বাধ্য করে এ চক্রটি। রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এ সিন্ডিকেটটি চালিয়ে আসছে রমরমা বাণিজ্য। জমি রেজিস্ট্রিতে ১ লাখ টাকার সম্পাদিত দলিলপ্রতি সর্বনিম্ন ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়। প্রশাসনের নাকের ডগায় এ যেন এক উন্মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্য। সেবাগ্রহিতারা এদের কাছে অনেকটা জিম্মি ও অসহায়।

অতিসম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের আকস্মিক ঝটিকা অভিযানে কুষ্টিয়া রেজিস্ট্রি অফিসের ঘুষ-দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে। গত ৭ নভেম্বর’১৯ বৃহস্পতিবার অফিস চলাকালীন দুদকের উপপরিচালক মো. যাকারিয়ার নেতৃত্বে কুষ্টিয়া রেজিস্ট্রি অফিসে পরিচালিত অভিযানে ঘুষের ১ লাখ ৪ হাজার ৪০০ নগদ টাকাসহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার সিংহ ও অফিস সহকারী রফিকুল ইসলামকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। দুর্নীতির দায়ে ঐ দুই জনের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং পরবর্তীতে তাদেরকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনার পর থেকেই জমি ক্রয়-বিক্রয়ে রেজিস্ট্রিসহ সরকারি এ দপ্তরের সেবামূলক সমস্ত কার্যক্রম ভেঙে পড়ে। অবশ্য দুদকের অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে  উল্লেখিত কথিত নেতারা দ্রুত সটকে পড়ে। জমি কেনাবেচায় প্রতি কর্মদিবসেই এ অফিসে ১২০ থেকে ১৫০টি দলিল রেজিস্ট্রি  হতো। বর্তমানে রেজিস্ট্রি অফিসে নেই কর্মচাঞ্চল্য।

এ দপ্তরের জেলা রেজিস্ট্রারসহ অন্যান্য কর্মচারী ও নিবন্ধিত ৪২ জন দলিল লেখক এখন অলস সময় কাটাচ্ছেন। কারা অন্তরীণ ঐ সাব-রেজিস্ট্রারের স্থলে নতুন কর্মকর্তা পদায়ন কিংবা প্রেষণে কাউকে দায়িত্ব অর্পণ না করায়  মানুষ সেবা থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। পাশাপাশি সেবা না পেয়ে দূর-দূরান্তের মানুষ প্রতিদিন  ফেরত যাচ্ছে। জমি রেজিস্ট্রিই এ অফিসের মূল কাজ। তবে এ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র কর্মকর্তা সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার সিংহ দুর্নীতির মামলায় কারা অন্তরীণ থাকায় এ অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নিত্যকার জনদুর্ভোগের পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব আয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর আগে অবৈধ টাকার জের ধরেই এ অফিসের দায়িত্বরত সাব-রেজিস্ট্রার নূর মোহাম্মদ শাহ ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর রাতে কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসাতে নিজ অফিসের কর্মচারীদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে খুন হন।

 ঐ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে পিওন ফারুক, কামাল ও নকলনবিশ সাইদুলকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরও রেজিস্ট্রি অফিসের সেবা কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে অবৈধ আয়ের উত্স ঘিরে দুষ্টচক্রের দৌরাত্ম্যে কুষ্টিয়া রেজিস্ট্রি অফিসের সেবা ও দাপ্তরিক কার্যক্রম বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

জনগুরুত্বসম্পন্ন রেজিস্ট্রি অফিসের সেবা নিশ্চিতকরণ ও দুর্নীতিরোধে সিন্ডিকেটের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেন কুষ্টিয়া কোর্টপাড়ার বাসিন্দা রোটারিয়ান জাহাঙ্গীর হোসেন। জেলা রেজিস্ট্রার প্রভাকর সাহা জানান, দলিল লেখক সমিতির অবৈধ বাণিজ্যের বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দিচ্ছে না। অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দাপ্তরিক অচলাবস্থার বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।