বিশ্ব দর্শন দিবস ও আমাদের প্রত্যাশা

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ২২:০৫

প্রাচীন জ্ঞানের রাজ্য গ্রিসের জ্ঞান ভান্ডারের অধিকাংশ অংশই দর্শনিকদের অবদান। জ্ঞানের জগতে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল প্রভৃতি ব্যক্তির অবদান অনস্বীকার্য। তারা সবাই ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক। তারা জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। যদিও মধ্যযুগে জ্ঞানচর্চা হতো ধর্মকেন্দ্রিক তবুও সেখানে আমরা বিখ্যাত দার্শনিকদের অবদান দেখতে পাই। যেমন: সেন্ট অগাস্টিন,  সেন্ট টমাস একুইনাস প্রমুখ।

   রেনেসাঁ পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানের অবদান মানুষকে বিজ্ঞানমুখী করে ফেলে। বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে করেছে সহজ-সরল। বিজ্ঞানের নিত্য-নতুন আবিষ্কার মানুষকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে। বিজ্ঞানের এই দ্রুত উন্নতির ফলে মানুষ আজ অনেক ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু এ ক্ষমতার অসম বণ্টনের ফলে মানুষের মধ্যে বৈষম্যের হচ্ছে। এতে পৃথিবীর মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সব সম্পদ একীভূত হচ্ছে। যার ফলে মানুষ নিজের নৈতিকতাকে ভুলে গিয়ে আত্মোন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানুষের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে আত্মোন্নয়ন সঠিকভাবে হয়নি। এতে করে মানুষের নৈতিকতার অবনতি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

আজ বিশ্বের দিকে তাকালেই দেখতে পাব চারদিকে চরম অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, মারামারিতে ভরে গেছে। যার প্রধান কারণ মানুষের নৈতিকতার অবক্ষয়। বিশ্বের এই অস্থিতিশীলতা, অন্যায়,  অশান্তি, সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা, অনৈতিকতা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিজ্ঞানের দ্বারা সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং দিন দিন বেড়েই চলছে। এই বৈশ্বিক অস্থিরতার সমাধানের একমাত্র পথ হলো নৈতিকতার উন্নয়ন। আর নৈতিকতার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দর্শনের চর্চা করা। কারণ দর্শনের মাধ্যমে আমরা পাই সত্যানুসন্ধানের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার শিক্ষা। এর দ্বারা মানুষের মুক্তবুদ্ধি ও নৈতিক চেতনাকে জাগ্রত করে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়। এ লক্ষ্যেই জাতিসংঘের  ইউনেস্কো ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো দর্শন দিবস ঘোষণা করে। এই দিবসের দ্বারা বিশ্ববাসীর প্রতি একটি বার্তা দেওয়া হয় বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার, দারিদ্র্য, সাংস্কৃতিক অধিকার, নারী অধিকার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি সমকালীন বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে দর্শনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ     এবং এসব সমস্যা সমাধানের জন্য এক গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন যা  হচ্ছে  দার্শনিক বিশ্লেষণ এবং তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্যে ইউনেস্কোর এই দিবস ঘোষণা করে। পরে ২০০৫ সালে ইউনেস্কোর সম্মেলনে বিশ্ব দর্শন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। প্রতি বছর নভেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার সারা বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালন করে আসছে। বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর দর্শন বিভাগসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে এই দিবসটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছে।

এ বছর  ইউনেস্কো আঞ্চলিক প্রেক্ষিতে দর্শনের প্রভাবের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সমস্যাগুলো দার্শনিক চিন্তা দ্বারা সমাধানের দিকে এগিয়ে যাক এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব গড়ে উঠুক—এটাই হোক আজকের প্রাত্যাশা। 

n লেখক :শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়