ধর্মঘটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৫৩

সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে বিভিন্ন জেলায় টানা তৃতীয় দিনের মতো বাস ধর্মঘট পালিত হয়েছে। গতকাল বুধবার বাসের সঙ্গে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচলও ছিল বন্ধ। গতকাল ১৫ জেলায় পালিত হয়েছে এ ধর্মঘট। এতে যাত্রীসেবা যেমন ব্যাহত হয়েছে তেমনি পণ্য পরিবহনও বিঘ্নিত হয়েছে। কিছু কিছু পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। কয়েকটি জেলায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা দাবি করেছেন, শ্রমিক ও বাসচালকরা নিজেরাই এই ধর্মঘট পালন করছে। তারা কেউ এই ধর্মঘটের নির্দেশ দেননি। এদিকে, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই খুলনায় সকাল থেকে জ্বালানি তেল পরিবহন ও পরিবেশনে নিয়োজিত ট্যাংক-লরি শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। ফলে খুলনা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬ জেলায় কোনো জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরে গতকাল কোনো পণ্য ঢোকেনি, আবার বেরও হয়নি। ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাতক্ষীরার ভোমরা          স্থলবন্দরে। এর ফলে বিপাকে পড়েছেন ভোমরা স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা। বরিশাল ও পিরোজপুরে হঠাত্ বেড়ে গেছে শাকসবজির দাম। টঙ্গিতে মহাসড়কে চলাচলকারী পরিবহনের ওপর হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে শ্রমিকরা। এতে পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের গাড়িতেও হামলা চালানো হয়।

অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

গতকাল বগুড়ার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিবহন মালিক বা শ্রমিক নেতারা কেউ ধর্মঘটের দায় নিচ্ছে না। বগুড়া জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সামছুদ্দিন শেখ হেলাল দাবি করেছেন, তাদের কোনো শ্রমিক ধর্মঘটে নেই। চারমাথা এলাকায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় দেখা গেছে, পরিবহন শ্রমিকরা বগুড়া-নওগাঁ সড়কে সিএনজিচালিত কোনো অটোরিকশা চলতে দিচ্ছে না। দেখলেই ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছে। যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল গতকাল। 

গতকাল খুলনার অভ্যন্তরীণ রুটে সকাল থেকে বাস চলাচলের কথা থাকলেও চালকরা বাস নিয়ে সড়কে বের হননি। বাসচালকদের মতো গতকাল সকাল থেকে ট্রাক মালিক-শ্রমিকরাও খুলনায় ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ট্যাংক-লরি শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করায় খুলনা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬ জেলায় কোনো জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়নি।

পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের বৈঠকে বাস ছাড়ার সিদ্ধান্তের পরও কেন বাস চলছে না—এ প্রশ্নের জবাবে খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম বেবী বলেন, চালকরা কেউ গাড়ি চালাতে চাচ্ছে না। অনুরোধ করা হলেও রাজি হচ্ছেন না। চালকরা উলটো বলছেন, দুর্ঘটনা ঘটলে সব জরিমানা আপনি দিবেন—এমন লিখিত দিলে আমরা গাড়ি চালাব। তবে রূপসা-মোংলা, রূপসা-বাগেরহাটসহ বেশ কিছু রুটে বাস চলাচল করেছে।  সড়ক পথে চলাচল বন্ধ থাকায় ট্রেনে উপচে পড়া ভিড় ছিল।

চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, বন্দর নিমতলি থেকে বিশ্বরোড, ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাংক রোড, পোর্ট কানেক্টিং রোড, বাংলা বাজার লাইটারেজ জেটি সংলগ্ন সদরঘাট রোড, জিইসি থেকে একে খান-ভাটিয়ারি, অলংকার, পাহাড়তলিসহ চট্টগ্রামের কোথাও কোনো ধরনের পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, কনটেইনারবাহী লং ভেহিক্যাল চলাচল করেনি।

রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স যাতায়াতও বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার জনসাধারণ গণপরিবহনের অভাবে সকাল থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েন। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থার কারণে চট্টগ্রাম চেম্বার, ট্রেডবডিসহ সর্বস্তরের ব্যবসায়ী মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের পক্ষ থেকেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত সব ধরনের যানবাহনের চলাচল সকাল থেকে বন্ধ থাকায় পণ্য ও কনটেইনার ডেলিভারিসহ অন্য কার্যক্রম হয়নি। এ পরিস্থিতিতে গতকাল প্রতিদিনের মতো ডেলিভারি দিতে না পারায় প্রায় ৪ হাজার টিইইউস পণ্য ভর্তি কনটেইনার বন্দর ইয়ার্ড ও জেটিতে আটকা পড়ে।  বাংলাদেশ প্রাইভেট ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) চট্টগ্রাম অফিস থেকে ইত্তেফাককে জানানো হয়, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-ট্রেইলার-লং- ভেহিক্যালসহ পণ্যবাহী যানবাহনের চালক-শ্রমিকরা সকাল ৮টা থেকে পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দিলে  ১৯টি প্রাইভেট আইসিডি অচল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় গতকাল ১৯টি প্রাইভেট আইসিডি থেকে ২ হাজার টিইইউস রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে পারেনি। বন্দর থেকে প্রতিদিনের মতো আসতে পারেনি অফডক প্রক্রিয়ার ১ হাজার টিইইউস আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার। চট্টগ্রামের প্রাইম মুভার ট্রেইলার মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ইত্তেফাককে বলেন, বন্দরের কন্টেইনার পরিবহন কাজে ব্যবহূত যানবাহনগুলো সকাল ৮টা থেকে চলাচল ও কন্টেইনার পরিবহন বন্ধ রাখে। পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ কর্মবিরতির মতো। ফলে বুধবার সারাদিন চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো ধরনের পণ্য ঢুকেনি, বেরও হয়নি। চালকরা সপ্তাহখানেক আগে থেকে পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তাদের এতোদিন বুঝিয়ে শুনিয়ে বিরত রাখা হলেও তারা গতকাল সকাল থেকে যানবাহন চালানো বন্ধ করে দিয়েছে।

টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকাসহ সকল সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। হবিগঞ্জে দুপুর একটার পর হঠাত্ অভ্যন্তরীণ সড়ক ও আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। মাদারীপুরে দূরপাল্লার বাসসহ অভ্যন্তরীণ রুটেও কোনো বাস চলেনি। টাঙ্গাইলের ভুঞাপুরে বাসস্ট্যান্ড নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চনের কুশপুত্তলিকায় জুতার মালা পরিয়ে দিয়ে সড়ক অবেরাধ করেছে শ্রমিকরা। ঝিনাইদহে গত তিন দিন ধরে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচলও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হয়। উত্পাদিত সবজি পচে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। পরিবহন মালিকরা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে এমন দাবি করে বুধবার সকালে রাজশাহী থেকে সকল রুটে বাস চলাচলের ঘোষণা দিয়েছেন মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহাতাব হোসেন চৌধুরী। তার ঘোষণার পরও রাজশাহীতে বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। বিভিন্ন পয়েন্টে বাস-ট্রাক ছাড়াও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলেও বাধা প্রদান করা হয়েছে। কোনো পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ছেড়ে যায়নি রাজশাহী থেকে। এদিকে, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার হুমায়ুন কবীর খোন্দকার সাংবাদিকদের বলেছেন, আইন অমান্য করে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ বা আন্দোলন করলে অবশ্যই তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

সাতক্ষীরায় তৃতীয় দিনের মতো ধর্মঘট পালন করে শ্রমিকরা। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল হতে সকাল থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ রুটের সকল বাস চলাচলও। তবে যাত্রীবাহী বাস বন্ধ থাকলেও বিআরটিসি বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। ভোমরা স্থল বন্দরের আমদানিকারক আব্দুল গফুর জানান, ধর্মঘটের কারণে তারা পণ্য পাঠাতে পারছেন না। তবে আমদানি রপ্তানিতে গতকাল পর্যন্ত তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন শুল্ক স্টেশনের কর্মকর্তারা।

সকাল থেকে টঙ্গীর চেরাগআলী মার্কেট, মিলগেইট, স্টেশন রোড, বোর্ড বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে। তারা গণপরিবহন ও মালবাহী ট্রাক সড়কের দুই পাশে দাঁড় করিয়ে রাখে। উত্তেজিত পরিবহন শ্রমিকরা গণপরিবহনের ড্রাইভার ও হেলপারদের মারধর ও ভাঙচুর করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের গাড়িতেও হামলা চালায়।

ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান চালক ও শ্রমিক ইউনিয়নের ধর্মঘটের কারণে সকাল থেকে আশুগঞ্জ সার কারখানা থেকে দেশের সাতটি জেলায় সার সরবরাহ বন্ধ ছিল। এছাড়া আশুগঞ্জ নদীবন্দর ও দেশের বৃহত্তম ধানের মোকাম থেকে সব ধরনের পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকাগামী দূরপাল্লার বাসসহ আশপাশের কোনো রুটেই পিরোজপুর থেকে বাস চলাচল করেনি। এতে মারাত্মক ভোগান্তি পোহান যাত্রীরা। বিশেষতঃ রোগী, বৃদ্ধ, শিশু ও  নারীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। যশোর-খুলনা থেকে শাকসবজিবাহী ট্রাক-পিকআপ আসায় শাকসবজির দাম বেড়েছে। ইন্দুরকানীতে লঞ্চ টার্মিনালে অনেক ভিড় দেখা গেছে।

বরিশালে ট্রাক কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হয়। শাক-সবজির মূল্য আরো এক দফা বেড়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে শীতকালীন আগাম সবজির দাম দ্বিগুণ হয়ে ৪০ টাকার স্থলে ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও বুধবার ধর্মঘটে তা একশ টাকা ছাড়িয়েছে। বরিশালের স্থানীয় কয়েকটি রুটে বুধবার সকাল থেকে যাত্রীবাহী বাস চলেছে। 

সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে সিলেটের খাদ্যপণ্যের বাজারে। পেঁয়াজের বাজারে প্রভাব পড়েছে বেশি। গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনরত শ্রমিকরা ধর্মঘট স্থগিত করে। এতে প্রায় আট ঘণ্টা পর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানচলাচল শুরু হয়।