২ লাখ টাকার মেশিন ৫৪ লাখে ক্রয়

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৫৩

অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ডুবছে উত্তরবঙ্গের কৃষির উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং হিসাব নিকাশ হাতে লেখার পদ্ধতির কারণেই ব্যাংকটির এমন অবস্থা হয়েছে বলে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সিএ) ফার্মের তথ্য থেকে জানা গেছে। সম্প্রতি এক অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণীর একটি হিসাবে দেখা গেছে বিভিন্ন ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এজেন্ট থেকে সংগ্রহ স্থিতি ১ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকার মধ্যে ১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার হিসাব মেলানো সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট ১৬৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার কোনো হদিস নেই। এই স্থিতির কোনো বিবৃতিপত্র এবং প্রত্যয়নপত্রও পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাকাব একীভূত করার প্রশ্ন উঠলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সিএ ফার্ম দিয়ে এই অডিট করার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী দুটি অডিট ফার্ম এ ব্যাংকের সার্বিক বিষয় অডিট করে। সেই অডিট প্রতিবেদনেই রাকাবের নানা অনিয়ম উঠে এসেছে।

টাকা গণনার যন্ত্র কেনায় অনিয়ম

অডিট প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, টাকা গণনার একটি যন্ত্র ৫৪ লাখ ৭ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। চলতি বছরের ৩০ জুনে এ ক্রয় দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে যন্ত্র ক্রয়ে একবার কম্পিউটার ও অন্যান্য উপকরণ হিসেবে আবার আরেকবার আসবাবপত্র হিসেবে ব্যয় দেখানো হয়েছে। ব্যাংকটি চলতি অর্থবছরে এমন ৫০টি যন্ত্র কিনেছে বলে জানা গেছে।

অন্যান্য ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে টাকা গণনার জন্য যেসব যন্ত্র পাওয়া যায় তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো যন্ত্রটির    দাম ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। সে হিসাবে টাকা গণনার যন্ত্র ক্রয়ের বিষয়টি ঠিক নেই বলেই অডিট ফার্ম মনে করছে। একইভাবে যানবাহন, জেনারেটর ক্রয়ের ক্ষেত্রেও প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দাম দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাকাবের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি রাকাব এস এম ই ফাইন্যান্স লি. এর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ৯৫ কোটি টাকা আর্থিক বিবরণীতে কম দেখানো হয়েছে। ব্যাংকটির সফটওয়্যার ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করা হয়েছে।

অডিট ফার্মের প্রতিবেদন বলছে, রাকাবের শাখাগুলোতে ইনফিনিটি ব্যাংকিং সল্যুশন (আইবিএস) সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় কিন্তু প্রধান কার্যালয়ের হিসাব সম্পাদনের জন্য কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় না। আর শাখাগুলো যে সফটওয়্যার ব্যবহার করে তার হিসাবও ম্যানুয়ালভাবে পরিবর্তন করা যায়। এক্ষেত্রে অনিয়ম করার সুযোগ থেকে যায়। আর আধুনিক এ যুগেও কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে না ব্যাংকটি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

৫৩২ কোটি টাকা সমন্বয়হীন

রাকাবে অডিট চলাকালীন সময়ের স্থায়ী সম্পত্তির রেজিস্ট্রার পাওয়া যায়নি, বিভিন্ন খরচের ভাউচার পাওয়া যায়নি, এমন ঘটনা অহরহ হয়েছে বলে অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকটির হেড অফিসের সঙ্গে শাখা অফিসগুলোর ৩১৩ কোটি টাকা, বিকেবির সাধারণ হিসাবের ১৭৩ কোটি টাকা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার নিকট দেনা ৪৬ কোটি টাকা অসমন্বিত অবস্থায় রয়েছে বলে অডিট ফার্মের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বগুড়া উত্তর ও দক্ষিণ, জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন জোনের সম্পদও অসমন্বিত অবস্থায় রয়েছে।

ব্যাংকের বোর্ড গঠন থেকে শুরু করে কর্মচারী সাধারণ ভবিষ্যত্ তহবিলের সুদ হিসাবায়নের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম পেয়েছে অডিট ফার্ম দুটি। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকে যে নিয়মিত নগদ সংরক্ষণ করতে হয় সেটাও ঠিকমত করা হয়নি। কোনো জায়গায় সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও লোকসানের বদলে লাভ দেখানো হয়েছে।

বাড়ছে খেলাপি ঋণ

এমন পরিস্থিতিতে রাকাবের অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়েছে। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ হওয়া ঋণের ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাত্ বিতরণ হওয়া ঋণের পাঁচ ভাগের এক ভাগই খেলাপি। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৭৭৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম না মেনেই ঋণ বিতরণ করছে। নিয়মানুযায়ী ব্যাংকের মোট আমানতের ৮৫ ভাগ ঋণ হিসাবে বিতরণ করতে পারে। কিন্তু ব্যাংকটি মোট আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, এ ব্যাংকের আমানত ৫ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা এবং ঋণ বিতরণ হয়েছে ৫ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। এতে চাহিদা অনুযায়ী আমানত না পাওয়ায় ব্যাংকটি নগদ টাকার সংকটে পড়েছে। নগদ টাকার অভাবে এ ব্যাংকে রাখা এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) এর মেয়াদ পূর্ণ হলেও পাওনা অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর রূপালী ব্যাংক লিমিটেড ৫০ কোটি টাকার একটি এফডিআরের অর্থ বারবার ফেরত নিতে চাইলেও তা ফেরত দিচ্ছে না রাকাব। এ বিষয়ে রাকাবের হেড অব ট্রেজারি বরাবর বেশ কয়েকবার চিঠিও দিয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার রূপালী ব্যাংক।

কর্মী বদলিতে অনিয়ম

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টিংয়ের বিষয়েও এ অনিয়ম চলছে। একই শাখায় ৮ থেকে ৯ বছর থেকে কোনো কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন। এর আগে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি শাখায় ডাটা এন্ট্রি অফিসার হাফিজুর রহমান আট বছর থেকে ৯৭ লাখ টাকা আত্মসাত্ করেন। পরে এটা প্রমাণ হওয়ায় এখন জেলে আছেন ঐ কর্মকর্তা।

ঢাকা করপোরেট শাখায় ২৮ জন জনবল রয়েছে; যার মধ্যে অন্তত তিন জন রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে। যা রাকাবের বদলি নীতিমালার লঙ্ঘন। প্রিন্সিপাল অফিসার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এ শাখায় রয়েছেন ২০১১ সাল থেকে। সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মাহমুদ হুসাইন ছিলেন ২০০৯ সাল থেকে। আইন বিষয়ে তার কোনো ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও এ ব্যাংকের মামলা তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে ছিলেন তিনি। সম্প্রতি এ শাখা থেকে বদলি করে তাকে আবারও আইন বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একই শাখায় থাকায় অনেক কর্মকর্তা যথাসময়ে অফিসে আসেন না বলেও অভিযোগ করেছেন ব্যাংকেরই অন্য কর্মকর্তারা।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এসব বিষয়ে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম সাজেদুর রহমান খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি সদ্য এই ব্যাংকে যোগ দিয়েছি। সবকিছু বুঝে নিচ্ছি। ব্যাংকে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ দীর্ঘদিন ধরে রাকাবের এমডি ছিলেন কাজী আলমগীর। যিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) এমডি হিসেবে সদ্য নিয়োগ পেয়েছেন। ব্যাংকের খারাপ অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যাংকের জনবল ঘাটতি ছিল। ক্ষেত্রবিশেষে কেউ কেউ কোনো কোনো পদের জন্য অপরিহার্য ছিল। অন্যদিকে ঢাকা করপোরেট অফিসে পোস্টিংয়ের জন্য স্থানীয় চাপও ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। অন্যান্য বিষয়ে বর্তমান এমডির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।