টুম্পার জন্য শোকগাথা

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৫২

অপরূপ সর্পিলাকার সন্ধ্যা নদীতে গত বুধবার সলিলসমাধি ঘটিয়াছে ১০ বত্সরের একটি তাজা প্রাণের। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার্থী টুম্পা আক্তার ঘটনার দিন দুপুর দেড়টার দিকে সন্ধ্যা নদীতে যাত্রী পারাপারের সময় যন্ত্রচালিত খেয়া নৌকা ডুবিয়া নিখোঁজ হয়। ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে টুম্পার লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় ডুবুরিরা। পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার পূর্ব আমরাজুড়ি ফেরিঘাটের পন্টুনে ঘটে এই নৌকাডুবির ঘটনা।

অত্যন্ত মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা। একটি বালিকা তাহার পড়ালেখার টানেই বিপজ্জনক সন্ধ্যা নদী পাড়ি দিতে উঠিয়া পড়িয়াছিল একটি যন্ত্রচালিত খেয়া নৌকায়। ঐ নৌকায় তখন পাঁচটি মোটরসাইকেলসহ ২৫/৩০ জন যাত্রী হুড়াহুড়ি করিয়া উঠিতে উদ্যত হয়। আর তাহাতেই ঘাটে নোঙররত অবস্থায় নৌকাটি ডুবিয়া যায় অকস্মাত্। ইহাতে নারী, শিশু, ছাত্রছাত্রীরা সাঁতরাইয়া তীরে উঠিতে পারিলেও অভাগা টুম্পা নিখোঁজ হইয়া যায় পানির তলায়। টুম্পার সহপাঠী পিইসি পরীক্ষার্থীরা জানাইয়াছে, টুম্পা আশোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল। ঐ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর পরীক্ষাকেন্দ্র পড়িয়াছে উক্ত উপজেলার কুমিয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কুমিয়ান বিদ্যালয়ে যাইতে আশোয়া বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের প্রতিদিন ট্রলারে করিয়া সন্ধ্যা নদী পারাপার হইতে হয়। দুর্ঘটনার দিন পরীক্ষা শেষ করিয়া ট্রলারে করিয়া বাড়ি ফিরিতেছিল টুম্পা ও তাহার অন্য সহপাঠীরা। আর নৌকাটি নোঙর করা অবস্থাতেই দড়ি ছিঁড়িয়া উলটাইয়া যায় যাত্রীদের হুড়োহুড়িতে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে ইহা স্পষ্টতই অনুধাবন করা যায় যে, এমন একটি যন্ত্রচালিত খেয়া নৌকায় কোমলমতি শিশুদের নিজ দায়িত্বে সন্ধ্যা নদীর মতো নদী পাড়ি দেওয়াটাই ব্যবস্থাটাকেই ‘হঠকারী’ বলা যায়। আমাদের আরো একটি জিজ্ঞাসা হইল, প্রাথমিক সমাপনীর পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্র কেন এমন একটি জায়গা দিতে হইবে যেইখানে যাইতে তাহাদের পাড়ি দিতে হইবে বিপত্সংকুল পথ? ঐ পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্র কি তাহাদের বিদ্যালয়ের নিকটস্থ কোথায় নির্ধারণ করা যাইত না? এই সকল বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা নীতিনির্ধারকরা কেন বাস্তবতা অনুধাবন করিতে পারিবেন না? তাহারা কি এই দেশের মানুষ নহেন? এই দেশের বৈচিত্র্যময় মানচিত্র কি তাহাদের অজানা, অচেনা? তাহারা কি ভুলিয়া গিয়াছেন যে, দেশ জুড়িয়া যেই লক্ষ লক্ষ দশ-এগারো বত্সর বয়সি বালক-বালিকারা পিইসি পরীক্ষা দিতেছে, সেই সকল শিশু-শিক্ষার্থীদের বৃহত্ একটি অংশকে স্কুলে যাইতে হয় ‘নিজ দায়িত্বে’?

টুম্পা নামের অভাগা মেয়েটি যেহেতু আমরাজুড়ি ফেরিঘাটের পন্টুনের নিকট হইতে খেয়া নৌকায় উঠিয়াছিল, সেহেতু ঐ ফেরিঘাটের ফেরি দিয়াই তাহারা নিরাপদে নদী পাড়ি দিতে পারিত। কিন্তু পরিবহন অবরোধ বা গাড়ি স্বল্পতা কিংবা অন্য যে কোনো কারণেই হোক ফেরির সার্ভিস টুম্পা গ্রহণ করিতে পারে নাই। ইহাও অত্যন্ত দুঃখজনক। এইসকল ফেরি ইজারা দেওয়ার সময় এই শর্ত জুড়িয়া দেওয়া প্রয়োজন যে, কোনো অবস্থাতেই ফেরি সার্ভিসের বিঘ্ন ঘটানো যাইবে না। মনে রাখিতে হইবে যে, ফেরি সার্ভিস কোনো সাধারণ ব্যবসা নহে, ইহা সেবামূলক ব্যবসা। এই ক্ষেত্রে এত দায়িত্বজ্ঞানহীন হইবার কোনো সুযোগ নাই। টুম্পার সলিলসমাধিতে আমরা ব্যথিত, শোকাহত। তাহার আত্মার শান্তি কামনা করিতেছি।