বিশাল এ নগরীতে চলতে গেলে কত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তার ঠিক নেই। চারদিকে কত অভিজ্ঞতার মানুষ ছড়িয়ে আছে, ক্লান্ত এ শহর তার খবর রাখে না। পথ চলতে চলতে কত-শত চরিত্রের সঙ্গে দেখা হয়। যারা সবাই মেহনতি মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ—জীবনের প্যাঁচে পড়ে আর চলতে পারেনি। মেধার বিকাশ ঘটেনি অন্যদের মতো। কাজের মধ্য দিয়ে তাই প্রকাশ ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরে ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাসায় ফেরার সময় একজন রিকশাওয়ালার কথায়, ভাষা ব্যবহারে বুঝতে পারলাম, তিনি আর দশজন রিকশাওয়ালার মতো নন। তিনি মূলত একজন লেখক। একজন কথাশিল্পী। সারাদিন রিকশা চালিয়ে বাসায় গিয়ে লিখতে বসেন। তিনি উপন্যাস লেখেন। ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তার তিনখানা উপন্যাস। রাত ১০টা গড়িয়ে গেছে, বৃষ্টি পড়ছে, মনে হয় আকাশটা ছিঁড়ে গেছে। তবুও এক ভবনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে স্বল্প আলোয় তার মুখ থেকে কথা শুনতে থাকি। বেটে-খাটো লোক। পেটানো শরীর। গেঞ্জি পরা, ঘাড়ে গামছা। নাম মহম্মদ মমিন (৫০)। বাড়ি উত্তর জনপদের দিনাজপুর জেলার বিরামপুরে। এইচএসসি পাশ করেছিলেন স্থানীয় কলেজ থেকে। বাবা কৃষক হারেছউদ্দিনের চার সন্তানের মধ্যে বড়ো তিনি। শৈশব থেকে এলাকায় বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করতেন। কাজের ফাঁকে পড়াশোনা করতেন। ছোটোবেলা থেকেই ছিল বই পড়ার ঝোঁক। তাই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বই পড়তে যেতেন স্থানীয় নুরুন্নবী লাইব্রেরিতে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, শরত্চন্দ্র, বঙ্কিমসহ বাংলা সাহিত্যের বড়ো বড়ো কবি-সাহিত্যিকের বই পড়তে পড়তে একসময় নিজের লেখার শখ জাগে। শুরুতে স্থানীয় পত্রিকায় লিখতেন। একসময় তাও বাদ দিতে হয় সংসারের কারণে। বিশেষত ১৯৯৪ সালে বিয়ে করার পর সংসারের খরচ বেড়ে যায়। যে জমি, তা চাষ করে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। এর মধ্যে তার সংসারে আসে দুই মেয়ে। তখন তিনি বগুড়ায় এসে রিকশা চালাতে থাকেন। এর মধ্যেই রাতে চলে লেখা। ১৯৯৫ সালে বগুড়ার একটা প্রেসে টাকা দিয়ে প্রকাশ করেন প্রথম বই ‘শেষ দেখা’ তারপরে বের হয় ‘কাঁচের দেয়াল’। এরপর আরো একটা বই বের হলে তিনি ২০১৬ সালে এক আত্মীয়ের পরামর্শে চলে আসেন ঢাকায়। এখানে চাকরি নেন গার্মেন্টসে। তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টসে এসে আমার চোখ খুলে যায়।’ মানুষ কত পাশবিক হতে পারে, তা তিনি গার্মেন্টসে এসে বুঝেছিলেন। ‘মানুষ ধনী হতে কীভাবে নির্লজ্জের মতো গরিব শ্রমিকদের ঠকায়, তা আগে বুঝতাম না। মানুষ জোকের চেয়েও খারাপ। জোক পেট ভরতে শরীর থেকে ঝরে পড়ে আর মানুষ শরীরে রক্ত থাকা পর্যন্ত ছাড়ে না। গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে রিকশা চালাই, কত ভালো আছি!’ এসব নিয়েও তার একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আছে। এখন লিখছেন ‘স্বপ্না তুমি কার?’। এই উপন্যাসের বক্তব্য সামাজিক অবক্ষয়ের মানুষের বিকৃত রুচির যে প্রকাশ ঘটছে, সেসব নিয়ে। সমাজে পুঁজিপতি শ্রেণির বিকাশ মূল অস্থিরতার কারণ বলে তিনি মনে করেন। সে বিষয়েই লিখছেন উপন্যাস।
মহম্মদ মমিনের বড়ো মেয়ে দিনাজপুর মেডিক্যালে নার্সিংয়ে পড়েন। ছোটো মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী। রিকশা চালিয়ে তাদের পড়ার খরচ চালান। ভালো আছেন। বিদায় নেওয়ার আগে আমি আমার বাসার নিশানা দেখিয়ে বলি, এখানে এলে আমাকে পাবেন। তিনি আমার নম্বর নিয়ে বললেন, আমার একটা বিশাল শখ আছে, আপনি পূরণ করতে পাবেন? তার বিনয়ের সঙ্গে করা এ প্রশ্নটি আমি জানতে চাই। তিনি বললেন, ‘আগামী বই মেলায় আমার দুই খানা বই কোনো স্টলে রাখার ব্যবস্থা করতে পারবেন?’ আমি বলি তা পারা যাবে। তিনি আমার হাত ধরে বললেন, ‘এটা আমার বহুদিনের শখ।’ আমি আশ্বস্ত করায় তিনি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। তারপর বৃষ্টির মধ্যেই আবার প্যাডেলে ধাক্কা দিতে দিতে বৃষ্টি ও অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
n লেখক :সাংবাদিক
