যুগে যুগে চিন্তাশীল মানুষেরা সুখী ও শান্তিকামী দেশ ও জাতির স্বপ্ন দেখিয়াছেন। কল্পনা করিয়াছেন ভবিষ্যতে এমন দেশ গঠিত হইবে, যেইখানে মানুষ জীবন উপভোগ করিবে; একের সঙ্গে অন্যে, এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশ সম্প্রীতির সঙ্গে পাশাপাশি অবস্থান করিবে। ইহা লইয়া বিশ্বসাহিত্যেও রচিত হইয়াছে অনেক সমৃদ্ধ উপন্যাস, কবিতা, গল্প। কিন্তু বিধি বাম। পৃথিবী একদিকে যত আধুনিক হইতেছে, যত প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিতেছে, অন্যদিকে ততই বাড়িয়া চলিয়াছে অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িকতা; রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বৈরিতা। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে আসিয়া আমরা দেশে দেশে যে অস্থিরতা দেখিতে পাইতেছি; মানুষের জীবননাশ, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা দেখিতে পাইতেছি, তাহাতে শঙ্কা হয়—এই পৃথিবী আদৌ আর স্বাভাবিক শান্তিপ্রিয় বাসযোগ্য স্থান হইয়া উঠিবে কি না। জনবহুল মহাদেশগুলির মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকা ছিল অপেক্ষাকৃত কম সহিংস। কিন্তু বর্তমানে এই মহাদেশের প্রায় প্রতিটি দেশেই চলিতেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। সম্প্রতি বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসকে দেশটির সেনাবাহিনীর অঙ্গুলিনির্দেশনায় দেশ ছাড়িয়া পালাইয়া মেক্সিকোয় গিয়া আশ্রয় লইতে হইয়াছে। সেই দেশে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইতে যাইতেছে, কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত ইভো মোরালেস আর প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াইতে পারিবেন না! ইহা এক ‘নূতন গণতন্ত্র’ আমরা অবলোকন করিতেছি! দক্ষিণ আমেরিকার আরেক দেশ চিলিতে সংবিধানের কয়েকটি ধারার বিরুদ্ধে গর্জিয়া উঠিয়াছে জনতা। ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ জন নিহত এবং ২ হাজার ৩০০ বিক্ষোভকারী আহত হইয়াছে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে। ভেনেজুয়েলায় জ্বালানিসহ দ্রব্যমূল্য আকাশ ছুঁইয়াছে। অসংখ্য মানুষ দেশ ছাড়িয়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে আশ্রয় লইয়াছে। মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করিয়াছে। শান্তি নাই ব্রাজিল, মেক্সিকো, ইকুয়েডর কোথাও।
আরব দেশগুলির তো কথাই নাই। ইরাকে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় মৌলিক অধিকার খর্ব হইবার অভিযোগে অক্টোবরে যে অস্থিরতা ও বিক্ষোভ তৈরি হইয়াছে, তাহাতে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ৩২৫ জন নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হইয়াছে। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর এত বড়ো হতাহতের ঘটনা আর ঘটে নাই। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানে এই পর্যন্ত শতাধিক মানুষকে প্রাণ দিতে হইয়াছে। কয়েক হাজার আহত হইয়াছে। কয়েক মাস হইল বাণিজ্যিক শহর হংকং প্রায় অচল হইয়া রহিয়াছে। ছাত্র-জনতার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ নিত্যদিনের বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন পরিস্থিতি আরো একবার উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে।
শান্তি নাই উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতেও। ফ্রান্সে ইয়েলো ভেস্ট মুভমেন্টে প্যারিসসহ বড়ো শহরগুলিতে নামিয়াছে বিক্ষোভকারীরা। গত কয়েক দিন দফায় দফায় সংঘর্ষ বাধিয়াছে। সরাসরি রাস্তায় সহিংসতা না হইলেও আরেক ধরনের সহিংসতা চলিতেছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসন করিবার প্রচেষ্টা লইয়া। ব্রিটেন অস্থির হইয়া আছে ব্রেক্সিট ইস্যুতে। তাই কবিগুরুর সেই পঙিক্তগুলিই স্মরণ করিতে হয় :‘আঁধারে আবৃত ঘন সংশয় বিশ্ব করিছে গ্রাস/ তারি মাঝখানে সংশয়াতীত প্রত্যয় করে বাস।’ আমরা এখনো আশাহত হই নাই। প্রত্যয় রহিয়াছে, আমাদের এই বিশ্ব একদিন বসবাসের উপযুক্ত হইয়া উঠিবে; উপযুক্ত শাসকেরা বিভিন্ন দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করিবেন। সাধারণ মানুষও অধিক দায়িত্বশীল হইতে শিখিবে।
