একবিংশ শতাব্দীতে একক বা ছোটো পরিবার নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি—ছোটো পরিবার মানেই সুখী পরিবার। স্বামী, স্ত্রী এবং একটি কিংবা দুটি সন্তান। কয়েক দশক আগেও বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, দাদা-দাদি নিয়ে ছিল যৌথ পরিবার। যৌথ পরিবারে একসঙ্গে থাকা-খাওয়া, হই-হুল্লোড়, আনন্দ-উত্সবের মজাই আলাদা। যৌথ পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। শহুরে জীবনের ঢেউ গ্রামেও লেগেছে। গ্রাম থেকেও যৌথ পরিবার উঠে যেতে বসেছে।
এক সময় গ্রাম কিংবা শহরে অনেক যৌথ পরিবার দেখা যেত। যৌথ পরিবারে অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। অবস্থাভেদে প্রতিটি পরিবারে সদস্য ছিল ২০ থেকে ৩০ জন। পরিবারের কর্তার আদেশ সবাই মেনে চলত। পৃথিবী যত এগিয়ে যাচ্ছে যৌথ পরিবার তত কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারের সুবিধা ও ঐতিহ্য।
যুগের হাওয়ায় যৌথ পরিবার ভেঙে যেতে যেতে পরিবারের সদস্য সংখ্যা এখন ৩ কিংবা ৪ জনে এসে ঠেকেছে। তদুপরি সবাই ব্যস্ত। এখনো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একান্ত আলাপচারিতা দেখি, অধিকাংশই তাঁদের একান্নবর্তী পরিবারের স্মৃতিচারণ করেন।
যান্ত্রিক শহুরে জীবনে ছেলেমেয়েরা নিজের পছন্দ করে বিয়ে করলেই মা-বাবা বেশ খুশি হন। দিন দিন সামাজিক রীতিনীতি বদলাচ্ছে, মানুষের মূল্যবোধ পরিবর্তন হচ্ছে। বদলাচ্ছে অনুশাসন কাঠামো। মানুষের আর্থিক স্বাধীনতা যত বাড়ছে, জীবন যাপনের স্বাধীনতাও ততটাই ভোগ করতে চাইছে। পরিবারগুলো ভাঙছে।
একক পরিবারে আয়-ব্যয় সঞ্চয় ভবিষ্যত্ নিজের মতো রক্ষিত হয়। কিন্তু যৌথ পরিবার হলো একটি বটবৃক্ষের মতো অর্থাত্ যৌথ পরিবারের সুবিধা একক পরিবারের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। যৌথ পরিবার হলে বিপদে-আপদে অনেককে পাশে পাওয়া যায়। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়। একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবারের সদস্যদের সবার একে অপরের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, আদর স্নেহ সবসময়ই অটুট থাকে। পরিবারে দাদা-দাদি, চাচা-চাচিদের উপস্থিতিতে যেসব শিশু বড়ো হয়, তাদের স্বার্থপর হওয়ার সুযোগ কম থাকে। তাদের মানসিক বিকাশ ও বন্ধন হয় সুদৃঢ়। আবার যৌথ পরিবারের সদস্যরা কখনো নিজেকে একা অনুভব করে না অথবা কোনো হীনম্মন্যতায় ভোগে না। যৌথ পরিবারে যে কোনো কাজ, জিনিসপত্র ইত্যাদি সকলকিছুই সদস্যদের মাঝে ভাগাভাগি হওয়ায় শিশুরাও উদার মনমানসিকতা নিয়ে বড়ো হতে শেখে, দায়িত্বশীল হতে শেখে। তাছাড়া পারিবারিক সাপোর্ট বেশি থাকায় যৌথ পরিবারের চাকরিজীবী মায়েদের জন্য অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।
পরিবারের যৌথ কাঠামো এই সামাজিক বন্ধন ও নৈতিক বন্ধন দৃঢ় করত। বড়োদের মান্য করা, প্রত্যেক সম্পর্ককে সম্মান করা, এসব কিছুই তারা শিখত গুরুজনদের কাছ থেকে। সেই পারিবারিক সম্পর্ক এখন দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। এখন চারপাশে জীবন ও জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত সবাই। পারিবারিক অনুশাসনের বাইরে চলে যাওয়ায় অভদ্রতা, অসম্মান করা আধুনিক ও স্মার্টনেস জ্ঞান করা হচ্ছে। ভদ্রতা, সম্মান করা এইসব বিষয় পরিবারের কাঠামো দাদা-দাদি, ফুপু, চাচা-চাচিদের কাছ থেকে শিখবে। কিন্তু যৌথ থেকে একক পরিবারে রুপান্তরিত হওয়ার কারণে শিশুটি কাজের মানুষটির কাছে সার্বক্ষণিক থাকায় কিছুই শিখতে পারছে না। তাই শিশুর আদর্শিক জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন যৌথ পরিবার। আসলে আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি যৌথ পরিবারের সুবিধা ও ঐতিহ্য।
ঢাকা
