ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে হত্যার নির্দেশদাতা হলেও ওই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অন্যতম খলনায়ক, পরিকল্পনাকারী ও অর্থলগ্নীকারী ছিলেন পৌর আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। এছাড়া হত্যার পূর্বপরিকল্পনার বিষয়টি সোনাগাজী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন জানলেও ওই ঘৃণ্য কাজ করা থেকে আসামিদের নিবৃত্ত না করে তাদের রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। তার এই নেতিবাচক ভূমিকা নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় ‘সরাসরি অংশগ্রহণের শামিল’ বলে রায় দিয়েছে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে বলা হয়, এটা নিশ্চিত যে, নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হবে এবং কারা দেবে সেটা ঘটনা সংঘটনের আগ থেকেই অবহিত ছিলেন রুহুল আমিন। কিন্তু অবহিত থাকার পরেও অগ্নিসংযোগ প্রতিহত না করে অগ্নিসংযোগকারীদের গা-ঢাকা দিতে পরামর্শ দেন। এই আসামি ইচ্ছা করলে অবশ্যই অন্যদের নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানো হতে নিবৃত্ত করতে পারতেন। এছাড়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন যে, মাকসুদ কাউন্সিলরকে অবহিত করেই তিনি শাহাদাত হোসেন শামীম ও নূরুদ্দিনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নুসরাতকে হত্যা করতে। তারা আমার এই কথার সঙ্গে একমত প্রকাশ করে। এছাড়া মাকসুদ কাউন্সিলরের পরামর্শ মোতাবেক গত ৪ এপ্রিল গভীর রাতে হত্যা পরিকল্পনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা আসামি নূরুদ্দিনের জবানবন্দিতে উঠে আসে। দোষ স্বীকারের জবানবন্দিতে তিনি বলেন, শামীম ও আমি মাকসুদ কাউন্সিলরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি হত্যার পরিকল্পনায় সায় দেন। শামীমকে ১০ হাজার টাকাও দেন কাউন্সিলর।
গত ২৪ অক্টোবর চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় সিরাজ, রুহুল, মাকসুদ, শামীম, নূরুদ্দিনসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। ২১১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ ঐ রায়ে আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, আসামি সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ও কাউন্সিলর মাকসুদের নির্দেশনা মোতাবেক গত ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিরাজ উদদৌলা মুক্তি পরিষদ গঠিত ও হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও আসামিদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় এটা পরস্ফুিটিত যে, সিরাজ উদদৌলা মুক্তি আন্দোলনের সংগঠক ও প্রধান শক্তি ছিলেন রুহুল আমিন। যিনি মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি। এর আগে রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলমের পৃষ্ঠপোষকতায় অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির দাবিতে জোরপূর্বক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের গত ২৮ ও ৩০ মার্চ মানববন্ধনে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হয়।
‘স্বার্থে বাধা দেওয়ায় হত্যার সিদ্ধান্ত’: রায়ে বিচারক বলেন, সিরাজ উদদৌলা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, নুসরাতকে হত্যা করতে শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুরুদ্দিনকে আমি নির্দেশ দিই। বিশেষ কায়দায় প্রয়োজনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে তা যেন আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয় সেটাও তাদেরকে বলি। এ বিষয়ে রুহুল আমিন ও মাকসুদ কাউন্সিলর তাদের যে কোনো সহযোগিতা করবে, এটাও বলি। টাকাপয়সার প্রয়োজন হলে তাদের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। এছাড়া থানা ও প্রশাসন তারা ম্যানেজ করবে। নুসরাত আমাদের সম্মিলিত স্বার্থের সামনে এসে যাওয়ায় হত্যার বিষয়ে তাদের জানাই এবং তারা এতে রাজি হয়।
