টঙ্গীতে জলাশয় ভরাট করে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্প

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৩৬

কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ঢাকার আশপাশে চলছে নদী-নালা ও জলাশয় ভরাটের মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কাজকারবার। জলাশয় ভরাট করে বিক্রি করা হচ্ছে প্লট, পরিকল্পনা করা হচ্ছে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণের। এমনই অভিযোগ পাওয়া গেছে প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি উত্তরা প্রবর্তন সিটির বিরুদ্ধে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানার সাতাইশ, দারাইল ও গুশুলিয়া মৌজার বিভিন্ন এলাকায় শত কোটি টাকার খাস জমি ও তুরাগ নদীর কিছু অংশসহ জলাশয় ড্রেজারের মাধ্যমে অবৈধভাবে মাটি দিয়ে ভরাট করে চলেছে। সরকার জলাশয় ভরাটকৃত স্থানে ভবন নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও উত্তরা প্রবর্তন সিটিতে জলাশয় ভরাটের কাজ অব্যাহত রয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে গাজীপুরের টঙ্গীতে জলাশয় ভরাট করা জমিতে পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন ও শেড নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদন না দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্র্রতি টঙ্গী এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগ করা হয় যে, উত্তরা প্রবর্তন সিটির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে টঙ্গীতে জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। পাশাপাশি সেখানে ধীরে ধীরে বিভিন্ন কোম্পানির নামে বহুতল ভবন ও শেড নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব নির্মাণে আইন অনুযায়ী যেসকল সংস্থার অনুমতি নিতে ও বিধি-বিধান অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, তা মানা হচ্ছে না। বিশেষ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ কাজ চলছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয় লোকজনের দুর্ভোগের কথাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আইনের বিধি-বিধান না মেনেই রাজউকের কর্মকর্তারা জলাশয় ভরাট করা ঐ সব জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জলাশয় ভরাটকারী ও অবৈধ দখলদার হিসেবে দুজনকে চিহ্নিত করে মামলা দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে দায়ের করা ঐ মামলায় পরিবেশ অধিদপ্তর টঙ্গীর সাতাইশ, দারাইল ও গুশুলিয়া মৌজায় শত কোটি টাকার খাস জমি ও জলাশয় ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি দিয়ে ভরাটের অভিযোগ আনা হয়।

সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, উত্তরা প্রবর্তন সিটির মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে গাজীপুরে সরকারি খাসজমি দখলের মহোত্সবে মেতে উঠেছে একটি মহল। সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতা ও ভূমি অফিস কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে সরকারি লিজের নামে-বেনামে খাসজমি জলাশয় পুকুর ভরাট করে দখলযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে তারা প্রকাশ্যে। টঙ্গীতে প্রায় অর্ধশত খাস পুকুর ও শত শত বিঘা খাসজমি রয়েছে। মাহবুবের নেতৃত্বে একটি কুচক্রী মহল দিন দিন খাস পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। গাজীপুরের টঙ্গীতে উত্তরা প্রবর্তন সিটির নামে অর্ধশত একর সরকারি খাসজমি ও জলাশয় ভূমি ভরাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দখলদাররা এর মধ্যে দাড়াইল মৌজায় ৬ একর, সাতাইশ মৌজায় ৭ একর ও গুশুলিয়া মৌজার কয়েক একর জমিসহ বিভিন্ন স্থানে জমি ভরাট করে নিজেদের দখলে নিয়েছে। এ বিষয়ে গাজীপুরা সাতাইশ এলাকার বাসিন্দা মাওলানা ইসমাইল হোসেন বলেন, উত্তরা প্রবর্তন সিটির পরিচালক মাহবুব একজন ভূমি ব্যবসায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে জলাভূমি ভরাট করে আসছেন অথচ জলাশয় ভরাট একটি গুরুতর অপরাধ বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে উত্তরা প্রবর্তন সিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘উল্লেখিত মৌজায় জমি কিনেছি কয়েক বিঘা। সরকারি খাসজমি ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে লিজ আবেদনের মাধ্যমে ভরাট করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে দুটি অর্ডার পেয়েছি। আর একটি অর্ডার পেলেই আইনি ঝামেলা থাকবে না। এলাকার কারো জমি ভরাট করার অভিযোগ সঠিক নয়।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, টঙ্গীতে জলাশয় ভরাট করে পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বহুতল ভবন ও শেড নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদন না করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে গত ৪ মার্চ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশে বলা হয়, যেগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলোও বাতিল করতে হবে। এ ব্যাপারে রাজউকের অথরাইজড অফিসার মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, টঙ্গীর এই এলাকায় উত্তরা প্রবর্তন সিটি নামে কোনো প্রকল্প আছে কিনা আমার জানা নাই।

স্থানীয় একজন চা দোকানি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘মাহবুব গংরা এই এলাকা গিলে খাচ্ছে। তারা রাস্তার উত্তরপাশের পুরাটাই দখল করেছে। কয়েকজন মালিক জমি না দেওয়ায় জোরপূর্বক রাতারাতি বালু ফেলে জমির পানি নামার পথও বন্ধ করে দিয়েছে তারা। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।’