সংবাদ সম্মেলন তখন শেষের দিকে। ইশান্ত শর্মার দিকে তাক করে একটা আবেগের তীর ছুঁড়লেন এক সাংবাদিক। প্রশ্নটা ছিল এমন, আপনি নিয়মিত টেস্ট খেলছেন। টি-২০, ওয়ানডে খেলতে না পারার কষ্ট আছে নিশ্চয়ই আপনার মনে।
আবেগটা যিকঞ্চিত্ নাড়িয়েছে ইশান্তকে। আবার নিজেকে সামলে নিয়ে যা বলেছেন, সেটা একজন সত্যিকারের মানুষ-ক্রিকেটারের সহজ জীবন-দর্শনের ছবি ফুটিয়ে তুলেছিল। শুক্রবার রাতে খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসা ইশান্ত বলেছিলেন, ‘খারাপ লাগে। কিন্তু আমি জীবনের এমন এক পর্যায়ে আছি, যেখানে আমি এগুলো আর চিন্তা করি না। এগুলো আমাকে প্রভাবিত করে না। আমার বয়স এখন ৩১। আমি শুধু খেলে যেতে চাই। এবং তখন সহজাতভাবেই আপনি ভালো করবেন।’
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে লাইন-লেন্থ খুঁজে ফেরা, এলোমেলো-খরুচে বোলিংয়েই যেন মূর্ত ছিলেন ইশান্ত। গত তিন-চার বছরে ভারতীয় পেস বোলিংয়ের সঙ্গে আমূল পরিবর্তন হয়েছে দীর্ঘকায় এই পেসারের। এখন নতুন বলে যে কোনো ব্যাটিং লাইনের জন্যই ভয়ের প্রতিশব্দ তিনি। গতির সঙ্গে সুইং, বাউন্স মিলে ২২ গজে ব্যাটসম্যানদের জীবন বিষিয়ে তুলতে সিদ্ধহস্ত ভারতীয় এই পেসার।
ইডেন গার্ডেনসে গত শুক্রবার টেস্টের প্রথম দিনে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনে ত্রাস ছড়িয়েছিলেন ইশান্ত। ২২ রানে নিয়েছেন ৫ উইকেট। যা তার ক্যারিয়ারে ১০বার ৫ উইকেট। মজার বিষয় হলো, ১২ বছর পর ভারতের মাটিতে ৫ উইকেট পেলেন তিনি। এর আগে ২০০৭ সালে ব্যাঙ্গালুরুতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১১৮ রানে ৫ উইকেট পেয়েছিলেন ইশান্ত। দেশের মাটিতে একযুগ পর ৫ উইকেট। তাতেও খুব উদ্বেলিত দেখাল না ইশান্তকে। বলেছেন, ‘আমি ভিন্ন কিছু করিনি। গত দুই বছরে আমরা ভারতের মাটিতে দ্বিতীয় সিরিজ খেলছি। আমরা দেশের বাইরে খেলছিলাম। তাই আমি সেই ফর্ম ধরে রাখতে চেয়েছি, যেভাবে আমি বিদেশে পারফরম করেছি এবং উইকেট নিয়েছি। যদি আমি বিদেশে উইকেট নিতে পারি তাহলে ভারতে কেন নয়?’
ফাস্ট বোলার হিসেবে নিজের বদলে যাওয়ার রহস্য সম্পর্কে ইশান্ত বলেছেন, ‘আমি এখন আমার ক্রিকেটটা উপভোগ করছি। আমি আগে অনেক চাপ নিতাম। আমি এখন শুধু উইকেট কিভাবে নিব সেই চিন্তা করি। এখন অভিজ্ঞতা আছে। তাই দেখি উইকেটে কি দরকার, লেন্থ ঠিক করা। ভারতে পারফরম করা সহজ।’
শুক্রবার ইমরুল কায়েসকে এলবির ফাঁদে ফেলে ইশান্তের শিকার উত্সব শুরু হয়েছিল। বলটা পড়েই ভেতরে ঢুকে যায়। একইভাবে নাঈম হাসান, এবাদতকেও বোল্ড করেছেন তিনি। বাঁহাতিকে ইনকামিং করা ডেলিভারি সম্পর্কে ডানহাতি এই পেসার বলেছেন, ‘আগে বাঁহাতিদের আউট সুইঙ্গার দিতাম। আমার প্রয়োজন ছিল বৈচিত্র্য যোগ করা, তাতে আপনার খেলাটা উন্নতি হবে। তখন ম্যাচেও করে দেখাতে আত্মবিশ্বাসী হব। তাই এই ম্যাচে আমি ইমরুল কায়েসকে ঐ বলেই আউট করেছি। এবং আরো যে দুটি বোল্ড করেছি সেগুলো একই বল।’
ইডেন টেস্টেও শুরুর ৪ ওভারে তেমন কিছু করতে পারেনি ভারতীয় পেসাররা। পরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে লেন্থ পরিবর্তন করেছেন ইশান্ত-উমেশরা। তাতেই মিলেছে সাফল্য। ইশান্ত বলেছিলেন, ‘লাল বলের চেয়ে গোলাপি বল একটু ভিন্ন। শুরুতে আমরা স্বাভাবিক লেন্থে বল করেছিলাম, বল বেশি সুইং করছিল না। তারপর আমরা লেন্থটা খুঁজে বের করেছি। আমরা তিন ফাস্ট বোলার নিজেদের মাঝে আলাপ করেছি। তারপর সঠিক লেন্থে বোলিং করা শুরু করেছিলাম।’
ইশান্ত-উমেশরা বদলে গেছেন সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এবং নিজেদের চেষ্টায়। আল-আমিন, এবাদতরা কবে বদলাবেন? উত্তরটা না হয় মহাকালের জন্যই তোলা থাক!
