উন্নয়নে বাধা গায়েবি হাত

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৩:১০

গত এক দশকে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশ এগিয়েছে কয়েক গুণ। অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রের সূচক ঊর্ধ্ব গতিতে ধাবিত হয়েছে এবং এখনো তা হচ্ছে। এক দশক আগেও মাথাপিছু আয় ৮০০ ডলারের নিচে ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা প্রায় ১৯০০ ডলার। দেশের প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের ওপরে। রাস্তাঘাট, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতি চোখে পড়ার মতো। এছাড়া নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট বা মেট্রোরেলের কাজ এগিয়ে চলছে। এছাড়া বিদ্যুতের আওতায় এসেছে দেশের প্রায় ৯৫ ভাগ মানুষ এবং ভবিষ্যত্ চাহিদা পূরণের জন্য কয়েকটি কয়লাভিত্তিক ও একটি পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের কাজও শুরু হয়েছে। মানব উন্নয়ন সূচকেও দেশ এগিয়েছে অনেক। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন স্বাভাবিক। কিন্তু এতসব উন্নয়ন হওয়ার পরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুটিকয়েক মানুষের জন্য আমরা পিছিয়ে পড়ছি।

গত কয়েক মাসে টক অব দ্য কান্ট্রি হচ্ছে—গুজব, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি, ছাত্ররাজনীতি, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি। যার পেছনে কাজ করছে কোনো গোপন হাত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব যেন এখন নিত্যকার ঘটনা। আর সে গুজবে সাধারণ মানুষ কোনো কিছু বিচার, বিবেচনা না করেই কান দিচ্ছে। এর ফলে নিরীহ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। একুশ শতকে এসে গুজবে কান দেওয়া সত্যি মেনে নেওয়া যায় না। ছাত্ররাজনীতির কয়েকটি ঘটনা সরকারকে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে এবং এর সঙ্গে কয়েকটি আন্দোলন ও সর্বশেষ আবরার হত্যাকাণ্ড। আবরার যেমন একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারাও দেশের সম্পদ হতে পারতেন, কিন্তু ছাত্ররাজনীতির এক বিচিত্র ও সংগঠনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের কারণে ২৬ জন মেধাবী ছাত্রকে ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে। অথচ বুয়েটে যা ঘটেছে সেটা কোনো রাজনৈতিক দলই মেনে নেবে না। সরকার যখন দুর্নীতি, মাদক ও ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযান শুরু করে তখন দেখা যায় গুটি কয়েক অসত্ ক্ষমতাবান লোক এসবের সঙ্গে জড়িত, যা সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। কিন্তু তারপরও দলমত নির্বিশেষে সরকার যেভাবে দুর্নীতি ও ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এসব ঘটনা একটু হলেও দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে, সরকারকে বাধ্য করেছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে অনাহূত ঘটনার দিকে দৃষ্টি দিতে?

এই যখন দেশের পরিস্থিতি তখন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও দুর্ঘটনা কমাতে সরকার জাতীয় সংসদে নতুন সড়ক আইন পাশ ও কার্যকরের ঘোষণা দেয়, ঠিক তখন সেই আইনের বিরোধিতা করে শুরু হয় পরিবহন ধর্মঘট। ফলে ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা ও পণ্যবাহী ট্রাক। শুধু পরিবহন শ্রমিকরা এভাবে আন্দোলন করতে পারে না, হয়তো ভেতরে বসে কেউ কলকাঠি নাড়াচ্ছে। যারা টেবিলে না বসে অযৌক্তিকভাবে দেশকে আন্দোলনের নামে স্থবির করে দিতে চায়, তারা দেশ ও জনগণের শত্রু। এই গায়েবি হাতের সন্ধান করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

এসব কিছুর মূলে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের কালো হাত। যারা জনগণ, সরকার ও দেশকে বিপাকে ফেলে শুধু নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ও উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে এসব ব্যবসায়ী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা সময়ের দাবি, আর তা না হলে অরাজকতা সৃষ্টি হতে বেশি সময় লাগবে না। ছোটো ছোটো দোকানে জেল জরিমানার চেয়ে যারা অসাধু উপায়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে—তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া এই উদ্ভট পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় দেশ, জনগণ ও সমাজের উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়