যুবলীগের কান্ডারি শেখ মনির ছেলে শেখ পরশ

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৩:১৪

যুবলীগের নতুন কান্ডারি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির বড়ো ছেলে অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশ। যার হাত দিয়ে গড়ে উঠেছিল যুবলীগ, সংকটে পড়ে উদ্ধার পেতে সেই শেখ মনির ছেলেকেই বেছে নিলেন সংগঠনটির কাউন্সিলররা। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে ভাবমূর্তির সংকটে থাকা যুবলীগের গতকাল অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসে শেখ ফজলে শামস পরশ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন সংগঠনটির ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মাইনুল হোসেন খান নিখিল।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগনে শেখ মনির বড়ো ছেলে ৫১ বছর বয়সি শেখ ফজলে শামস পরশ এতদিন রাজনীতি থেকে দূরেই সরিয়ে রেখেছিলেন নিজেকে। গত ১০ বছর ধরে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পাশ করেন পরশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে আবার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার ছোটো ভাই শেখ ফজলে নূর তাপস এরই মধ্যে রাজনীতিতে এসে সংসদ সদস্য হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। পরশ-তাপসের চাচা শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। শেখ সেলিমও একসময় যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি ওমর ফারুক চৌধুরীও হয়েছিলেন যুবলীগের চেয়ারম্যান। পরশের ঠিক আগেই যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন তার ফুপা ওমর ফারুক চৌধুরী। ওমর ফারুকের দায়িত্ব পালনের মধ্যেই বিতর্কের মধ্যে পড়তে হয় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় যুবলীগকে।

গত সেপ্টেম্বরে এক সভায় যুবলীগ নিয়ে শেখ হাসিনার উষ্মা প্রকাশের পর ঢাকায় ক্যাসিনো বন্ধে র্যাবের অভিযানে প্রকাশ পেতে থাকে সংগঠনটির নেতাদের নাম, গ্রেফতারের পর বহিষ্কৃতও হন কয়েকজন নেতা। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে থাকা যুবলীগ নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগ আসতে থাকে ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে। একপর্যায়ে শেখ হাসিনার নির্দেশে যুবলীগ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় ওমর ফারুক চৌধুরীকে। সম্মেলন বা কংগ্রেসের দিন-তারিখও দিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এবং তা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাবেক সংসদ সদস্য চয়ন ইসলামকে। তবে তার সঙ্গে রাখা হয় সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদকে। সম্মেলন প্রস্তুতির জন্য যুবলীগের যে কমিটি হয়েছিল, তাতে আকস্মিক পরশের যুক্ত হওয়া আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে তাকে।

গতকাল বেলা ১১টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। পরে বিকালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে যুবলীগের কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয় যাতে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কাউন্সিলের নেতৃত্ব নির্বাচনের অধিবেশনে কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান চয়ন ইসলাম পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে পরশের নাম প্রস্তাব করেন। তখন বিদায়ি সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ তা সমর্থন করেন। আর কোনো নামের প্রস্তাব না ওঠায় পরশের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ সময় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের ভেতরে-বাইরে হাজারো নেতাকর্মী বিপুল করতালি এবং স্লোগান দিয়ে পরশকে স্বাগত জানান। নতুন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণার পর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছয় জনের নাম প্রস্তাব করেন কাউন্সিলররা। এরই মধ্যে সদ্য বিদায়ি কেন্দ্রীয় কমিটির পাঁচ নেতা হলেন বেলাল হোসেন, মহিউদ্দিন আহমেদ, সুব্রত পাল, বদিউল আলম ও ইকবাল মাহমুদ। এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সভাপতি মাইনুল হোসেন খানের নাম প্রস্তাব করা হয়। এরপর সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীদের নিজেদের মধ্যে সমঝোতার জন্য ওবায়দুল কাদের নির্দেশ দেন।

পরে তারা সমঝোতায় ব্যর্থ হলে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পরামর্শ করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম ঘোষণা করা হয়। ক্যাসিনো কেলেংকারিতে ভাবমূর্তি সংকটে পড়া আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন যুবলীগকে উদ্ধারের এ দায়িত্ব তিন বছর পালন করবেন পরশ-নিখিল।

এর আগে শুক্রবার সম্মেলনের প্রস্তুতি দেখতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছিলেন, তখন তার সঙ্গে পরশও ছিলেন। এরপর সম্মেলনের অভ্যর্থনা উপ-কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কার্যালয়ে তিনি গেলে কর্মীরা করতালি দিয়ে ‘পরবর্তী চেয়ারম্যান’ হিসেবে তাকে শুভেচ্ছা জানান।  আওয়ামী লীগের দুই জন নেতা বলেন, ‘এতদিন ধরে রাজনীতিবিমুখ পরশ তার ফুপু শেখ হাসিনার নির্দেশেই রাজনীতিতে নামছেন। সত্ ও মেধাবী নেতৃত্ব তুলে আনার অংশ হিসেবেই পরশের মতো একজনকে রাজনীতিতে আনা শেখ হাসিনার নিজস্ব চিন্তার ফসল।’

পঁচাত্তর ট্র্যাজেডিতে বাবা-মাকে হারানো পরশ-তাপসের বেড়ে ওঠা চাচাদের সঙ্গে। পরশ ধানমন্ডি সরকারি বালক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নেওয়ার পর দেশে ফিরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে আসছিলেন তিনি। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও রাজনীতির মাঠে দেখা যেত না পরশকে। এমনকি ছোটো ভাই তাপসের নির্বাচনী প্রচারেও তাকে খুব একটা নামতে দেখা যায়নি। কিন্তু এবার ফুপুর নির্দেশ উপেক্ষা করতে না পেরে বাবার গড়া সংগঠনের দায়িত্ব নিতে হলো তাকে।

শেখ ফজলুল হক মনি ছিলেন যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ’। তিনি সংগঠনটির দায়িত্ব দেন নিজের ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ মনিকে। দুই বছরের মাথায় কংগ্রেসে শেখ মনিই যুবলীগের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে শেখ মনি নিহত হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে যুবলীগের পুনর্জাগরণে সংগঠনটির চেয়ারম্যান হন আমির হোসেন আমু। এরপর তৃতীয় কংগ্রেসে মোস্তফা মহসিন মন্টু, চতুর্থ কংগ্রেসে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, পঞ্চম কংগ্রেসে জাহাঙ্গীর কবির নানক যুবলীগের চেয়ারম্যান হন। ২০১২ সালে ষষ্ঠ কংগ্রেসে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ওমর ফারুক।

একজন কর্মী হিসেবে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব : পরশ

যুবলীগের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ সংগঠনের একজন কর্মী হিসেবে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলমান কর্মসূচিকে দ্বিতীয় বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করে তা সফল করতে কাজ করবেন বলেও জানান।  গতকাল যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শেখ পরশ আরো বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ এবং তার কন্যার দেশের প্রতি হূদয়ের ভালোবাসা থেকে আমি সাহস পাই। তাই আজ আমি আপনাদের সামনে বলতে চাই, আমার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হচ্ছে আমি সম্পূর্ণ সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব।’

ফজলে শামস পরশ আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ শহিদের রক্ত দ্বারা তৈরি একটি অনুভূতির নাম’- আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে যুবলীগ সভাপতি বলেন, আমি একজন শহিদের সন্তান। ছোটো বেলায় আমি এবং আমার ভাই শেখ ফজলে নূর তাপস মা-বাবাসহ অন্য স্বজনদের হারিয়েছি। তাই আমি রাজনীতি থেকে অনেক দূরে ছিলাম। আমাদের দুঃখ শুধু বঙ্গবন্ধু কন্যাদ্বয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা অনুধাবন করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন, কিন্তু ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রের কারণে সে বিপ্লব সম্পূর্ণ হয় নাই উল্লেখ করে যুবলীগের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান বলেন, আজকে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স কর্মসূচি দিয়েছেন সেই কর্মসূচিকে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের একটি কর্মসূচি হিসেবে দেখি। আমার চেষ্টা থাকবে, যুবসমাজ যেন ‘আই হেইট পলিটিকস’ নীতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে কাজ করতে প্রেরণা পায়।