আমাদের কিছু স্বভাব পরিবর্তন করা দরকার

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩৬

আজকাল আমাদের স্বভাবে, চরিত্রে বেশ কিছু অশোভনীয় আচরণ দৃশ্যমান হয়ে ওঠছে। এই অশোভনীয় আচরণ শোভনীয় করতে হলে আত্মসমালোচনা করতে হবে। বিদেশিরা আমাদেরকে ‘হুজুগে বাঙালি’ বলে। এই ব্যঙ্গাত্মক সম্বোধনে তাদের প্রতি ক্ষিপ্র হওয়াটা স্বাভাবিক; কিন্তু এটাকে নিছক ঠেস মারা কথা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। আমরা কি আসলেই হুজুগে? বাঁশ কেটে পানি পান করলে নাকি রোগ ভালো হবে। এই ‘হবে’ কথায় উন্মাদ হয়ে বাঁশ কেটে পানি পানের জন্য অস্থির হয়ে গেলাম! পদ্মা সেতু তৈরিতে মাথা লাগবে এবং দেশে এর জন্য ছেলেধরা নামছে—এই কথার সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে জীবিত মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেললাম! পেঁয়াজের দাম বাড়ছে, লবণের দামও বাড়তে পারে। এই ‘পারে’ শব্দের গুজবে কান দিয়ে কিংবা মূল্য বৃদ্ধির মিছে আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে লবণ কিনে দোকান শূন্য করে ফেললাম। এরপরও কি বিদেশিদের ‘হুজুগে’ বলাটাকে অসঙ্গতিপূর্ণ বলবেন? দুর্নীতি শব্দটা বাঙালি সমাজে এক সময় প্রচলিতই ছিল না; কিন্তু এখন এর বিষক্রিয়া আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে। একে থামাতে কমিশন (দুদক) গঠন করেও থামানো যাচ্ছে না।

দাবি আদায়ে কর্মবিরতি দিয়ে হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়ে রোগীর প্রতি নির্দয় হবার মতো ঘৃণ্য ঘটনাও আমরা ঘটিয়ে থাকি! একজন নাগরিকের প্রধান কাজ হলো দেশকে ভালোবাসা, দেশের আইন মানা; কিন্তু আইনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ প্রায় উঠেই গেছে! সড়কের দিকে তাকালে দেখা যায়, পথচারী কিংবা চালক কেউই এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। নিজেকে বাঁচাতেও ট্রাফিক আইন মানা হয় না। একটু ফাঁকফোকর পেলেই গাড়ি নিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করি। আইন না মেনে উলটো নতুন তৈরি হওয়া আইন যাতে বাস্তবায়িত না হয় সে জন্য তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে রাস্তায় ধর্মঘট ডাকি এবং কোনো চালক অপরাধের দায়ে আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হলে তখনো ধর্মঘট ডাকি। অপরাধ করলেও কি তাকে সাজা দেওয়া যাবে না? যাদের দেশে লিখিত সংবিধান নেই তারা স্বেচ্ছায় আইন মানে। অথচ আমাদের দেশে সুসংগঠিত আইন ও সুলিখিত সংবিধান থাকলেও আইনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। আইনের ঊর্ধ্বে উঠে কেমনে চলা যায় সেই প্রবণতা আমাদের মাঝে বাসা বেঁধেছে। সরকারি চাকরি নিতে গেলে অভিজ্ঞতার আগে সামনে দাঁড়ায় আর্থিক লেনদেনের বিশাল পাহাড়। এই দুর্গম গিরি ডিঙিয়ে যে অপর প্রান্তে যেতে পারে সে পায় সোনার হরিণের মতো সরকারি চাকরি; আর যে পারে না সে থেকে যায় বেকার। টাকা ছাড়া চাকরি পাওয়া যায়—এটা যেন এখন এক অবান্তর কল্পনা। এই ‘ওপেন সিক্রেট’ নিয়ে কারো মুখে কোনো প্রতিবাদের ভাষা শুনতে পাই না। আচ্ছা, এগুলো তো বাঙালির স্বভাব ছিল না, আমাদের অস্থিমজ্জায় এগুলো কোত্থেকে বাসা বাঁধল? দিন দিন আমরা আধুনিক হচ্ছি ঠিক; কিন্তু তার সঙ্গে আমরা আমাদের নিজস্ব আচা-আচরণ জলাঞ্জলি দিচ্ছি। আধুনিকতা মানা তো নিজের শেকড় কিংবা অস্তিত্বকে ভুলে যাওয়া নয়। নিজেদের কৃষ্টি-কালচার মেনে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনে এগোনোই এর মূল কথা। তাই আমাদের পুরোনো দিনের খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতি, আচার-আচরণকে সঠিকভাবে পালন করতে হবে। পরিবর্তন করতে হবে এই আইন না মানা, গুজবে কান দেওয়ার স্বভাব। রুক্ষ আচরণ পরিহার করে উদারতা আনতে হবে আমাদের স্বভাবে। অনৈতিকতার মন্ত্র ঝেড়ে ফেলে দিয়ে গাইতে হবে নৈতিকতার গান। অন্য কোনো জাতি আমাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করার সাহস করবে না। বাহিরের দৃষ্টিতে কোনো খুঁত ধরার আগেই আমাদের নিখুঁত হতে হবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়