অরক্ষিত রেলপথ

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৪২

বাংলাদেশে রেলওয়ের যাত্রা শুরু হইয়াছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে, ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে  কলকাতা হইতে রানাঘাট পর্যন্ত রেলযাত্রা শুরুর দুই মাস পরই রানাঘাট হইতে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথের শুরু। ইহার পর আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে বিস্তৃত হইয়াছে। অতঃপর মানচিত্র বদলাইয়াছে তিনবার। এই সময়ের মধ্যে রেলওয়ে কিছু না কিছু প্রসারিত হইয়াছে। তবে পূর্বের রেলওয়ের সঙ্গে আজকের রেলওয়ের কিছু হতাশাজনক পার্থক্য তৈরি হইয়াছে যেই কারণে, তাহা ক্ষোভের সঙ্গে স্মরণ করাইয়া দিতে হয়। পূর্বে এই বাংলাদেশে অথবা পূর্ব পাকিস্তানে অথবা পূর্ববঙ্গে মানুষ ছিল কম, রাস্তার সংখ্যা ছিল কম, সেই সঙ্গে রেলপথও ছিল কম। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাধীন বাংলাদেশে এখন মোট রেলপথ রহিয়াছে কমবেশি ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। লেভেল ক্রসিং রহিয়াছে ২ হাজার ৫৩১টি। যাহার মধ্যে ১ হাজার ৪১২ লেভেল ক্রসিং রহিয়াছে অবৈধ, অনুমোদনহীন। মজার ব্যাপার হইল, এই ১ হাজার ৪১২ অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের কথা কর্তৃপক্ষেরও জানা রহিয়াছে। এই অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তা প্রদানের নির্দেশনা চাহিয়া উচ্চ আদালতে প্রার্থনা জানানো হইয়াছে।

খুবই ভালো কথা। তবে ইহার বাইরেও রহিয়াছে হাজার হাজার ছোটখাটো পথ, যেইখান দিয়া  মোটরসাইকেল চলিতেছে, রিকশা ভ্যান চলিতেছে নিজ দায়িত্বে! এইগুলিকেও কি লেভেল ক্রসিং বলা যায়! ইহার অর্থ গোটা বাংলাদেশের রেলপথ অরক্ষিত! দুঃখের বিষয় রেলওয়ের বিভিন্ন আইন বা নিয়ম না মানিয়া চলে রেল কর্তৃপক্ষ, না মানে জনগণ।  রেলওয়ের আইন অনুযায়ী রেলপথের দুই পাশে ১০ ফুট করিয়া মোট ২০ ফুট জায়গার মধ্যে চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। অথচ আমরা কী দেখিতে পাই? ঢাকা শহরেই বহু স্থানে রেলপথের উপরই বাজার বসিয়া যাইতেছে! রেলওয়ের আইন অনুযায়ী রেলপথে ফেঞ্চিংয়ের ব্যবস্থা করিবার সুযোগ রহিয়াছে। তদুপরি রেলওয়ে পুলিশের গ্রেফতার করিবার ক্ষমতাও রহিয়াছে। কিন্তু কোনো ধরনের উদ্যোগই দেখিতে পাওয়া যায় না।

এইসব বিষয়ে জানিতে চাওয়া হইলে কর্তৃপক্ষ এককথায় জানাইয়া দেন, রেলওয়েতে লোকবলের অভাব রহিয়াছে। কথা সত্য যে, রেলওয়েতে ১২ হাজারের অধিক পদ শূন্য রহিয়াছে। কিন্তু এইসব পদে লোক নিয়োগে কেন বত্সরের পর বত্সর বিলম্ব হইতেছে, তাহা আমাদের জানা নাই। কর্তৃপক্ষ কিছু নিয়োগ প্রক্রিয়া চালাইয়া থাকেন। কিন্তু তাহা লইয়া স্বজনপ্রীতি, অনিয়মের অভিযোগ উঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা করিয়া দেওয়া হয়। ফলে আর লোক নিয়োগ আগায় না। এইসব দীর্ঘসূত্রতার পিছনে যে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দায় রহিয়াছে ,তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। সর্বোপরি ইহা মনে রাখিতে হইবে, এইরকম ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মাকড়সার জালের মতো ছড়াইয়া থাকা নানা ধরনের সড়কে রেলওয়ে একা কিছু করিওতে পারিবে না, যদি জনগণ সচেতন হইয়াও আগাইয়া না আসে। নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের পাশাপাশি এই জনগণকে সচেতন করিবার একটি দায়িত্বও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে লইতে হইবে।