হিমেল আহমেদ
বাংলাদেশে গুজবের মহামারি অবস্থা চলছে। এটা কিন্তু আবার গুজব নয়! আসলে গুজবের প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে কোনটা সত্য আর কোনটা বানোয়াট মানুষ বিশ্বাস করতেও দ্বিধান্বিত হচ্ছে। গুজবের অনেক জঘন্য পরিণতি আমরা দেখেছি। এই গুজব নির্মূল করাই বর্তমানে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি লবণের দাম বাড়ার গুজবে সারাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। দাম বাড়ার গুজবে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ কিনে ঘরে মজুত করে নিয়েছেন এরই মধ্যে। এভাবেই যদি সবাই মাত্রাতিরিক্ত লবণ কিনে জমা করে রাখেন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই লবণের সংকট দেখা দিবেই! সেই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দাম বাড়াবে! বাংলাদেশে লবণের কোনো সংকট নেই এবং সংকট হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের রয়েছে নিজস্ব সমুদ্রসৈকত। আর লবণ প্রাকৃতিকভাবেই সমুদ্রেই থাকে। তাই লবণ সংকটের প্রশ্নই আসে না। আমাদের এতটুকু জ্ঞান রাখা উচিত। এ গুজবের পিছনে দৌড় না দিয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে বিচার করা উচিত। লবণের মিথ্যে দাম বাড়ার গুজবের কারণে হাতাহাতি, মারামারি পর্যন্ত হয়েছে। কে কত বেশি লবণ কেনার প্রতিযোগিতায় ভালোই লাভবান করেছে লবণ ব্যবসায়ীদের। যার শিকার হয়েছে সাধারণ জনগণ। পেঁয়াজ নিয়েও বাংলাদেশে অস্থিরতা কম হয়নি।
এ গুজবের কারণে বেশ কিছুদিন আগে ছেলেধরা সন্দেহে অনেক নিরীহ ও নির্দোষ ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সাভারে বাসা ভাড়ার খোঁজ করতে গিয়ে এক নির্দোষ নারী ছেলেধরা সন্দেহে জনতার গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা যান। আরেকটি আলোচিত ঘটনা হলো নিজের চার বছর বয়সি সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর খবর জানতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তাসলিমা বেগম রেনু। যার মৃত্যু সারাদেশে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। এরূপ অনেক নির্দোষ ব্যক্তি ছেলেধরা সন্দেহে নির্মমভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। যা সত্যিই আমাদের জন্য চরম লজ্জার। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের জুন পর্যন্ত ছয় মাসেই গণপিটুনিতে মারা গেছেন ৩৬ জন। অথচ তাদের অধিকাংশ নির্দোষ ছিলেন। তারা বুঝতেই পারেননি তাদের কেন এত নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে! আমরা এতটা নির্মম হতে পারি কীভাবে? নাকি ধরে নেব এসবের পিছনে রয়েছে কুচক্রী কোনো মহল? আধুনিক ডিজিটাল যুগে এসেও আমরা অবাস্তব সব গুজবে বিশ্বাস করে বসি তা সত্যিই বেদনাদায়ক।
কিছুদিন আগেই পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে এবং সে কারণে ছেলেধরা এবং কল্লাকাটারা নেমে পড়েছে এমন গুজব দেশে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। এই গুজব চলাকালে এক ব্যক্তির হাতে একটি বাজারের ব্যাগে একটি শিশুর কাটা মাথা পাওয়া যায়। তারপর লোকটাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। এই সূত্র ধরেই ছেলেধরার গুজব বিদ্যুত্গতিতে ছুটে যায়। দেশের আনাচেকানাচে ছেলেধরাও ধরা পড়ে! প্রতিবন্ধী, শিশু এবং নারীরাও সেই গুজবের হাত থেকে রেহাই পায়নি। সন্দেহের ভিত্তিতে যাকেই ছেলেধরা মনে হয়েছে, তাকেই পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। আমরা এতটা নির্মম হতে পারি বিশ্বাস হয় না! পরে জানা গেল যাদের পিটানো হলো তারা ছেলেধরা ছিলেন না! আর যে লোকটির হাতের ব্যাগে কাটা মাথা পাওয়া গিয়েছিল, সে ছিল এক জন মাদকাসক্ত। সে পদ্মা সেতু কী জিনিস তা জানতই না! বাংলাদেশে গুজব রকেটের গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। যার পিছনে কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে; বাংলাদেশে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার খুব বেড়ে গিয়েছে। তাই সেকেন্ডের মধ্যেই গুজব ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র।
বাংলাদেশে প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আর জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করছেন প্রায় ২ কোটি চল্লিশ লাখ মানুষ। আর যে সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাই গুজবকে মাথাচাড়া দিতে সাহায্য করে। যদি বলা হয়, ফেসবুককেই গুজবের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা অত্যুক্তি হবে না। তথ্যপ্রযুক্তিতে ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশ এগুচ্ছে ঠিকই কিন্তু বিজ্ঞানের আবিষ্কারের অভিশাপগ্রস্তও হচ্ছে। বাংলাদেশের অবস্থা এমন যে ফেসবুক বন্ধ করা যাবে না। আমরা দেখেছি অতীতে নির্বাচনের দিনগুলোতে যখন ফেসবুক বা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হতো তখন সমালোচনার ঝড় বইত সারাদেশে। ফেসবুক বন্ধের আমি নিজেই বিরোধী। কেননা মাথাব্যথার সমাধান মাথা কাটা নয়! তাই গুজব ঠেকাতে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রণয়ন জরুরি। ফেসবুক, ইমো, ভাইবার, হোয়াটস অ্যাপসের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো দিয়ে যেন গুজব প্রচার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের। আমাদেরও উচিত সত্যতা যাচাই করে ফেসবুকে তা শেয়ার করা। শুধু অনুমান বা শোনাকথায় কান দিয়ে গুজব ছড়ানো একটি অপরাধ। তাই আসুন, আমরা সবাই গুজব থেকে বিরত থাকি। অন্যকেও গুজব প্রচারে নিরুত্সাহিত করি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া
