উত্পাদনমুখী খাতে কমছে বিনিয়োগ

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৯, ২২:০৯

শিল্প বা উত্পাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ কতটা হলো তার ধারণা পাওয়া যায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির হিসাব থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে দেশে ৬৮৯ মিলিয়ন (৬৮ কোটি ৯০ লাখ) ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৮৭ মিলিয়ন ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য নতুন করে এলসি খোলার পরিমাণও কমেছে। এ সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম এলসি খোলা হয়েছে। অন্যদিকে এ সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। প্রথম দুই মাসে ২ হাজার ৯০৮ মিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল আমদানি হয়েছে। যা আগের বছরের প্রথম দুই মাসে ছিল ৩ হাজার ১১১ মিলিয়ন ডলার।

শিল্পে ব্যবহূত মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল কমে যাওয়ার পাশাপাশি সার্বিক আমদানিও কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে যে অর্থবছরের প্রথম তিন মাস জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি প্রায় ৩ শতাংশ কমে গেছে। শিল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নতুন করে তেমন কোনো শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না। আবার যারা উত্পাদনে আছেন তারাও তাদের কারখানা সম্প্রসারণ করছে না। ফলে শিল্পমালিকরা কোনো রকমে তাদের কারখানা চালিয়ে নিচ্ছেন।

নতুন শিল্প স্থাপন বা কারখানা সম্প্রসারণ না হওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলছেন যে এখনো পর্যন্ত শিল্পকারখানায় গ্যাসের সমস্যা রয়েছে। বিদ্যুত্সংযোগ পেতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। আর অবকাঠামোগত সমস্যা তো রয়েছেই। এছাড়া সরকার সুদহার কমানোর কথা বলেও বাস্তবে তা কোনো কাজে আসছে না। কারণ এত বেশি সুদ দিয়ে কোন শিল্পকারখানা টিকে থাকাটা আসলেই কঠিন।

উত্পাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মো. হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, উত্পাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ থমকে গেছে। শিল্পকারখানাগুলো এখন টিকে থাকার সংগ্রামে রয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে ব্যাংকগুলোতে আর্থিক সংকটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গিয়েছে। আর ব্যাংক ঋণের সুদের হার এত বেশি যে ঋণের কিস্তি দিয়ে মাসিক খরচ চালানোই কঠিন। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়াটা শিল্পকারখানার জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসাবে দেখা দিয়েছে।

আমাদের দেশে অবকাঠামো সমস্যার কারণেও নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না বলে মনে করেন এ শিল্পোদ্যোক্তা। প্রতিযোগী সব দেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এমনকি মিয়ানমারেও গভীর সমুদ্রবন্দর রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত এ সুবিধা নেই। মো. হাতেম বলেন, আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের সাহস ও সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সদিচ্ছার কারণেই শিল্প টিকে আছে।

এদিকে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে গত বছর থেকেই তোড়জোড় শুরু হয়। সুদহার কমানোর কথা বলে ব্যাংকগুলো সরকার থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিলেও বাস্তবে সুদহার কমায়নি বেশির ভাগ ব্যাংক। যারা কমিয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই নগন্য। ফলে ব্যবসায়ীদের সেই উদ্বেগ থেকেই গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে গড় সুদহার ১০ দশমিক ৪৩ ভাগ। বিআইবিএমের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সুদহার অনেক বেশি।

বিনিয়োগের খরা বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, এটা অনেকদিকের পুঞ্জিভূত সমস্যা। এর পরও কয়েকটি সমস্যার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক খাতের সক্ষমতা কমে গেছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া ব্যবসার খরচ অনেক বেড়েছে। আর সবচেয়ে বড়ো সমস্যা দেশ থেকে পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বলেন, রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় এবং সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ও কর বাড়ানোর ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে। তবে গত চার মাসেই ৩৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যের ৪ ভাগের ৩ ভাগ। সরকারের এ ঋণের চাপে বেসরকারি খাতের ঋণ কমে যাচ্ছে।