ইউসুফ আলী চৌধুরী ওরফে মোহন মিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর। তার পিতা খান সাহেব ময়েজউদ্দিন চৌধুরী সাধারণ অবস্থা থেকে নিজ চেষ্টায় একজন জমিদারে উন্নীত হন। কিশোর বয়স থেকেই স্বজাতির কীসে মঙ্গল হবে—এ চিন্তায় প্রায়ই তিনি বিভোর থাকতেন। ফরিদপুর শহরে সে সময় মাত্র চার-পাঁচ ঘর মুসলমান পরিবার সচ্ছল ছিল। বাকি সবারই ছিল জরাজীর্ণ দশা।
তিনি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমাজকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার দিকে লক্ষ রেখেই ফরিদপুর শহরের উপকণ্ঠে ‘বায়তুল আমান’ নামে একটি কৃষিশিল্প শিক্ষা প্রকল্প চালু করার প্রয়াস পান।
‘বায়তুল আমান’ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পাঁচটি : এক. ইসলামের আদর্শ, কৃষ্টি ও সভ্যতায় অনুপ্রাণিত করে মানুষের মন গড়ে তোলা; দুই. আধুনিক সভ্যতা ও বিজ্ঞানের সঙ্গে দেশবাসীর পরিচয় ও সম্পর্ক স্থাপন করা; তিন. জনসাধারণের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ, কর্তব্যবোধ ও কর্মশক্তি সম্বন্ধে চেতনা সৃষ্টি করা; চার. বিশ্বভ্রাতৃত্বের ভাবধারায় প্রত্যককে আদর্শ নাগরিক ও সত্যিকার মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলা এবং পাঁচ. জনসাধারণের মধ্যে আত্মোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। এই পাঁচ লক্ষ্য সামনে রেখে এই প্রকল্পে যেসব কর্মসূচি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয় তার মধ্যে ছিল : ১. আবাসিক স্কুল ও মাদ্রাসা; ২. শিল্প (ইন্ডাস্ট্রিয়াল) বিদ্যালয়; ৩. কৃষি ও ডেইরি ফার্ম; ৪. মত্স্য চাষ; ৫. ছাপাখানা ও মুখপত্র; ৬. বায়তুল আমানের কর্মকর্তা-কর্মীদের আদর্শ বসতি; ৭. মসজিদ; ৮. লাইব্রেরি; ৯. ব্যায়ামাগার; ১০. মেহমানখানা; ১১. পল্লি উন্নয়ন এবং ১২ চিকিত্সা ও জনস্বাস্থ্য। সেই ১৯৪৫ সালে এবং অগ্রসর শিক্ষা পরিকল্পনা ছিল এক কথায় বিস্ময়কর। মোহন মিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টির মাধ্যমে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর শেরেবাংলা মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দিতেন।
নিজে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণেই হয়তো তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে পশ্চাত্পদ সমাজের উন্নতি সাধনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম ও প্রধান চিন্তা ছিল কীভাবে শিক্ষার আলো মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে দেবেন। এই চিন্তার ফসলই ছিল ফরিদপুর শহরে ময়েজউদ্দিন হাই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা। জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯২৬ সালে তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মশিক্ষার সমন্বয়ে নিউ স্কিম পদ্ধতির এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি শিক্ষার সঙ্গে আদর্শ ও বাস্তবতার নিগূঢ় সম্পর্কের ব্যাপারে তার প্রখর সজাগ তারই প্রমাণ দেয়। শুধু শহরে নয়, গ্রামাঞ্চলেও যাতে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়তে পারে, তার জন্য তিনি বিলনলিয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি জুনিয়র মাদ্রাসা। মমিন খাঁর হাটে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি হাইস্কুল। সে সময় শহরে মুসলমান শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই আসত গ্রাম থেকে। শহরে বা আশপাশে জায়গিরের ব্যবস্থা করতে না পেরে অনেকেই উচ্চশিক্ষার আশা চিরতরে বিসর্জন দিতে বাধ্য হতো। এ সমস্যা মোকাবিলা করতে মোহন মিয়া ১৯৩৮ সালে মুসলমান দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার সুবিধাসহ মুসলিম স্টুডেন্ট হোম নামক অভিনব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সারা বাংলার বুকেই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।
নারীরা সমাজের অর্ধাংশ। নারী জাতিকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই উপলব্ধিতেই ১৯৩২ সালে ময়েজউদ্দিন হাই মাদ্রাসার অদূরে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন একটি জুনিয়র গার্লস মাদ্রাসা, যা এখনো তার স্মৃতি বহন করে হালিমা গার্লস হাইস্কুল নামে টিকে আছে।
ফরিদপুর শহর ছাড়া তদানীন্তন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার অন্যত্র কোথাও উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। তিনি যখন ফরিদপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, তখন শিক্ষা উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা ও শিক্ষার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জেলা বোর্ড তহবিল থেকে অর্থ দান করেছেন। মোহন মিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টির মাধ্যমে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর শেরেবাংলা মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন করে প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং পরে সদলবলে মুসলিম লীগে যোগদান করেন। ১৯৪০ সালে শেরেবাংলা যখন মুসলিম লীগ দলীয় প্রধানমন্ত্রী, তখন মোহন মিয়া ফরিদপুর জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৪১ সালে শেরেবাংলা মুসলিম লীগ ত্যাগ করে ‘শ্যামা হক’ মন্ত্রিসভা গঠন করলেও মোহন মিয়া মুসলিম লীগেই থেকে যান। ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন নবরূপ পরিগ্রহ করে। ‘বাঁচো এবং বাঁচতে দাও’ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান দাবিতে অচিরেই উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। ফরিদপুর জেলায় পাকিস্তান আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন ইউসুফ আলী চৌধুরী ওরফে মোহন মিয়া। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর একপর্যায়ে তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন এবং পরে শেরেবাংলা গঠিত কৃষক-শ্রমিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মোহন মিয়া ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন।
n লেখক :প্রবীণ অধ্যাপক
