নিরপরাধ সাইফুল ও শাওনের পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০১৯, ০১:২২

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার সাড়ে তিন বছরের মধ্যে কেউ ঐ ঘটনায় নিহত নিরপরাধ সাইফুল ও শাওনের পরিবারের খোঁজ নেয়নি। জঙ্গি হামলার পর কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হন। কিন্তু এর সঙ্গে আরো একজনকে যোগ করে বলা হয়েছিল ছয় জঙ্গি নিহত হয়েছে। ঐ ব্যক্তিটি হলেন—হলি আর্টিজানের শেফ সাইফুল ইসলাম চৌকিদার। নিহত পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে তার লাশটিও জুরাইন কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি সিটিটিসি তদন্ত করে সাইফুলের সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য পায়নি।

সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের পরিবার বর্তমানে শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কেউ তার পরিবারের খোঁজ নেয়নি। চরম দুরবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আর্টিজানের ডিশ ক্লিনার নিহত জাকির হোসেন শাওনের পরিবারও। ২০১৬ সালের ৮ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান শাওন। পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রশাসনের লোকজন শাওনকে জঙ্গি সন্দেহে আটক করে পিটিয়ে হত্যা করেছে। শাওনের বিরুদ্ধে কোনো জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পায়নি হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

শরীয়তপুরের নড়িয়ার কলুকাঠি গ্রামের মৃত আবুল হাসেম চৌকিদারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সাইফুল। ১০ বছর জার্মানিতে থাকার পরে দেশে ফিরে হলি আর্টিজানে যোগ দিয়েছিলেন সাইফুল। সেখানে পিত্জা শেফ হিসেবে কাজ করছিলেন দেড় বছর ধরে। জঙ্গি হামলার পর সাইফুলের লাশ উদ্ধারের পর তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়। পুলিশের কাছে দুইবার আবেদন করেও লাশ পরিবারের কাছে দেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জুরাইন কবরস্থানে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম নিহত পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে সাইফুলের লাশ দাফন করে দেয়। লাশ দাফনের খবর স্ত্রী সোনিয়া বেগমের কাছে যখন পৌঁছে তখন তিনি ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ঐ বছরের ১৩ অক্টোবর তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। নাম রাখা হয় হাসান। জন্মের আগেই বাবাকে হারানোর দুঃখের কথা জানিয়ে সোনিয়া বলেন, এখন এসব কথা বলে কী লাভ। কেউই আমাদের খোঁজ নেয় না। হাসানের এখন বয়স তিন বছর, সে এখন কথা বলতে শিখছে। কেউ যদি জানতে চায়, বাবা কোথায়? হাসানের সহজ-সরল জবাব- ‘আব্বু আছে’। আকাশে কখনো হেলিকপ্টার দেখলেও বলে ওঠে, ‘ঐ যে আব্বু হেলিকপ্টারে করে আসছে’। বাবা কোথায় আছে সেটা না জানলেও হাসানের শিশুমন হয়তো এখনো বিশ্বাস করে তার বাবা একদিন ঠিকই বাড়ি ফিরবে। সাইফুলের মা সমেরা বেগমের দুঃখ, নিরপরাধ ছেলের লাশটাও তারা পাননি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা তো দূরের কথা, খোঁজ পর্যন্ত কেউ নেয়নি।

জাকির হোসেন শাওনের (১৭) বাবার নাম আব্দুস সাত্তার। মায়ের নাম মাকসুদা খাতুন। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী নয়াপাড়া একরামপুর এলাকায়। চার ভাইবোনের মধ্যে শাওন ছিল দ্বিতীয়। স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। বাবা আব্দুস সাত্তার এক সময় বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। পরিচিত এক সূত্রের মাধ্যমে তিনি ডিশ ক্লিনার হিসেবে যোগ দেন হলি আর্টিজানে। তার ইচ্ছা ছিল শেফ হওয়ার। কিন্তু শেফ হওয়া হয়নি তার।

গতকাল সিদ্ধিরগঞ্জের নয়াপাড়ার তাদের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, এক রুমের বাসা নিয়ে ভাড়া থাকেন শাওনের পরিবার। সে রুমেই থাকেন তার মা, বাবা, বোন ও আরো দুই ভাই। মায়ের পিঠা বিক্রির টাকা আর বোনের গার্মেন্টসের চাকরির আয়ে এখন সংসার চলে। তা থেকে দিতে হয় ঘর ভাড়াও। স্বল্প আয়ের সংসারে টাকার অভাবে বিছানার খাটও কেনা হয়নি তার পরিবারের। শাওনকে হারিয়ে বড়ো বিপদে আছেন তারা। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তার মা। পাশাপাশি একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে না পারায় শাওনের মা এখন চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন। অন্যদিকে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শাওনের বাবা ছেলের শোকে কিছুই করতে পারেন না। ?শুধু বোবার মতো পাড়া মহল্লায় ঘুরে বেড়ান। শাওনের মায়ের অভিযোগ, শাওনকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ব্যাপক মারধর করা হয়েছিল। চিকিত্সাধীন থাকা অবস্থায় শাওন বারবার একটি কথা বলেছে—‘আমারে আর মাইরেন না ভাই। আমারে ছাইরা দেন।’

শাওনের মায়ের দাবি, তার ছেলে কোনো রাজনৈতিক বা জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তারপরও তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে মারধর করা হয়েছে। যার চিহ্ন তার পা ও বুকের মাঝে ছিল। এ কারণেই পরবর্তী সময়ে তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। শাওনের বোন সোনিয়া আকতার বলেন, ‘ভাইটা যদি জঙ্গিদের হাতে মইরতা তাও একটা কতা আছিল। কিন্তু তাও না, জঙ্গিদের হাত থাইকা পালাইতে গিয়া প্রশাসনের হাতে মইরা গেল। কই ভাইটা মরার এতদিন হইলো কেউ আমাগো খোঁজ নিল না। অনেকে নাকি টেকা পয়সা পাইল, কিন্তু আমাগো ভাগ্যে কিছুই জুটল না।’

জঙ্গি হামলার ঘটনায় সাইফুল ও শাওনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা বা হলি আর্টিজানে প্রত্যক্ষ হামলার যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘তারা দুই জনই হলি আর্টিজান বেকারির স্টাফ এবং তাদের কারোরই সন্ত্রাসী কার্যের সঙ্গে জড়িত বা হলি আর্টিজানে প্রত্যক্ষ হামলাকারী/সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো কানেকশন ছিল না। তারা দুর্ঘটনার শিকার মাত্র।’