আটকানো কি যায় দিবারাত্রির চক্র?

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৫৩

অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু সর্বদা স্মরণযোগ্য একটি প্রবাদ হইল—‘এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে।’ অন্যদিকে, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ হইতে বলা হয়, শেষ বলিয়া কিছু নাই। কিন্তু কোনো মানুষ যখন দিনের মধ্যগগনে দিবাকরের আলোয় উজ্জ্বল থাকে, তখন রাতের অমাবস্যার কথা চিন্তাই করিতে চাহে না। ইহা অনেকটা ছোটোবেলায় বৃষ্টি-বিক্ষুব্ধ আষাঢ়ের রাতে হারিকেনের আলোয় ভূতের গল্প শুনিয়া প্রচণ্ড ভয়ে কুঁকড়াইয়া থাকিবার মতো, যখন ঘরের এবং বাহিরের প্রতিটি আসবাবপত্র ও বৃক্ষরাজিকে মনে হয় ভূতের ছায়া। অথচ সকালের সূর্যোদয়ের পর ঐ একই আসবাবপত্র বৃক্ষরাজিকে দেখিয়া যে কাহারো হাসি পাইবে এই ভাবিয়া যে, ইহাদের দেখিয়াই কিনা বোকার মতো ভয়ে সিঁটকাইয়া থাকিতে হইয়াছিল! দিনের বেলা যেমন মনে হয়, ভূত বলিয়া কিছু নাই, উহারা কোনোকালে ছিলও না। তেমনি অমাবস্যার রজনীতে মনে হইতে পারে, জগত্ আসলে জুজুতে ভরা। অন্ধকার ঘরভর্তি যেন সাপ আর সাপ, পা রাখিব কোথায়?

দিবা ও রাত্রির এই বিষয়টি ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীনতার মতো—যখন কেহ বৃহত্ ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন ইহা ভাবিতে পছন্দ করে না যে, পুনরায় রাত্রি আসিবে। গতকাল টাইমস অব ইন্ডিয়ার বাংলা ভার্শনে একটি গ্রাফ ছাপা হইয়াছে, যেইখানে দেখা গিয়াছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের দখলে ছিল ৭১ শতাংশ রাজ্য। আর ২০১৯-এর নভেম্বর, বিশেষ করিয়া মহারাষ্ট্রীয় কাণ্ডের পর দেখা যাইতেছে, শাসকদলের দখলে রহিয়াছে মাত্র ৪০ শতাংশ রাজ্য। গ্রাফটির শিরোনাম ছিল, ‘পায়ের তলার মাটি সরছে...’। কথা হইল, পায়ের তলা মাটি তো সরিয়া যাওয়াটাই দস্তুর। মাটির বাঁধ দিলে যেমন উহাকে বত্সরে কয়েকবার মেরামত করিতে হয়, নচেত্ মাটির বাঁধ ধসিয়া যায়—সেই কারণে ইহা বলাই যায় যে—মাটির কাজই হইল একটি সময় আসিয়া পায়ের তলা হইতে সরিয়া যাওয়া। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হইল, যতক্ষণ পায়ের তলায় মাটি থাকে ততক্ষণ মনে হয়, ইহা মাটি নহে, পাথর। উহার তলে পানি নহে, কংক্রিট রহিয়াছে। এই কারণে যতক্ষণ অবধি ‘ক্ষমতার মাটি’ পায়ের তলায় থাকে, ততক্ষণ অবধি মনে করা হয়, ইহা কোনোদিনও ধসিয়া পড়িবে না। নমরুদ-ফেরাউনও যেমন ভাবিয়াছিল, তাহারা অসীম ক্ষমতার অধিকারী। একসময় যেমন বলা হইত, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত যাইবে না। মহাপ্রতাপশালী রাজা-বাদশারা যেমন মনে করিতেন, তাহাদের অক্ষয় সময় কখনো ফুরাইবে না।

প্রশ্ন হইল, যাহারা গহন রাত্রির অন্ধকার দেখিয়া আসিয়াছে, তাহারা কেন ভুলিয়া যাইবেন পৃথিবীর দিবারাত্রির চক্রের কথা? মিত্রের কথা প্রয়োজন ফুরাইলে যাহারা ভুলিয়া যাই, তাহারা ‘বর্তমান’কেই শেষ কথা বলিয়া মনে করে। ইহা অপরিণামদর্শিতা, ইহা বাড়াবাড়ি। ধর্মেই নিষেধ রহিয়াছে কোনো কিছু লইয়া বাড়াবাড়ি না করিতে। সুতরাং মনে রাখিতে হইবে, মধ্যাহ্নের দুর্দান্ত-প্রতাপশীল সূর্যকেও একটি সময় অস্তাচলে যাইতে হইবেই। শত বাড়াবাড়ি করিয়াও সূর্যাস্ত প্রতিহত করা যাইবে না। ইহা স্মরণে রাখিলে তাহা সকলের জন্যই মঙ্গল।