দাউদকান্দিতে শ্রমিকের হাট

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ২১:১৬

মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি

কারো হাতে দা, আবার কারো হাতে কোদাল কিংবা কাস্তে। তাদের অধিকাংশের সুঠাম দেহ, যেন শরীরটাই পুঁজি। তাদের কারো শরীর আবার শীর্ণ-কায়া। এদের মধ্যে আছে তরুণ, যুবক ও বয়োবৃদ্ধ। তাদের কেউ বসে আছেন, কেউবা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। তাদের দৃষ্টি খুঁজে ফেরে ক্রেতাদের। হ্যাঁ-তারা কারো ভাষায় ‘দিনমজুর’, আবার কারো ভাষায় ‘কামলা’ কিংবা ‘বদলি’। ঘাম ঝরানো শ্রম বিক্রি করে চলে তাদের সংসার। এটি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডের প্রতিদিনের ভোরের চিত্র। সেখানে ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে তাদের শ্রম বিকিকিনি। ফজরের আজানের পর ভোরের আধো আলোয় তারা ঘর থেকে বের হয়ে শ্রম বিক্রি করতে এই বাসস্ট্যান্ডে দল বেঁধে আসতে শুরু করেন। সেখানে তাদের কিনে নিতে আসেন আরেক শ্রেণির মানুষ। তারা বাজারের নানা পণ্যের মতো দর কষাকষি করে কাজের জন্য তাদের নিয়ে যান।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মুরাদনগর, দাউদকান্দি, চান্দিনা, হোমনা, মেঘনা, তিতাস এবং চাঁদপুর জেলার কচুয়া ও আশপাশের উপজেলার দিনমজুররা কাজের খোঁজে প্রতিদিন ভোরে দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এসে জড়ো হন। কাজও মেলে তাদের। মজুরিতে রয়েছে ভিন্নতা। কাজের ধরন অনুযায়ী তারা ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পেয়ে থাকেন। দাউদকান্দির হরিপুর গ্রামের রবিউল হক, আজগর আলী, হুমায়ুন কবিরসহ অন্তত ১২ জন কৃষকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এ এলাকায় শীত মৌসুমে গোল আলু, পটল, টম্যাটোসহ নানা জাতের সবজির ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে। তাই এসব সবজির আবাদের জন্য জমি তৈরি করা, রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করা, জমি পরিষ্কার করা এবং পাকা ধান কাটাসহ অন্যান্য কাজে এই ধরনের শ্রমিকের বেশি প্রয়োজন হয়। তারা সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত একবেলা কাজ করে থাকেন। বিনিময়ে কৃষক একজন শ্রমিককে দুই বেলা খাবার দেন। এসব শ্রমিকের মধ্যে জমির আগাছা পরিষ্কারের কাজের জন্য প্রতিজন শ্রমিক ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, ধান কাটার জন্য ৪৫০ টাকা, রাজমিস্ত্রির সহকারী (জোগালি) ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, মালামালের বোঝা টানার জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন।

এদিকে কাজের জন্য গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে আসা মুরাদনগর উপজেলার মকবুল হোসেন, আবদুল কাদিরসহ অন্তত ৮ জন দিনমজুরের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এখন কাজ যেমন বেশি, তেমন শ্রমের দামও বেশি। এই মৌসুমে এখানে প্রতিদিন শ্রম বিক্রি হয়, তাই আমরা এখানে চলে আসি। তবে মহাজনেরা (কৃষক) এক বেলার জন্য কাজে নিয়ে একটুও বিশ্রাম দিতে চান না। তারা আমাদের দিয়ে মেশিনের মতো কাজ করাতে চান। হোমনার মকবুল হোসেন, আলাউদ্দিন, ফরিদ মিয়াসহ বেশ কয়েকজন দিনমজুর জানান, বাজারে চাল, পেঁয়াজ, তরি-তরকারিসহ সবকিছুর দাম এখন অনেক বেশি। শ্রম বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায় তাতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। এছাড়া যখন কাজ জোটে না, তখন ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হয়।

এদিকে আক্ষেপ কণ্ঠে দাউদকান্দির হরিপুর গ্রামের জালাল উদ্দিন, মন্তাজ মিয়া, আলী আহমেদসহ অন্তত চার জন কৃষক বলেন, কামলারা (দিনমজুর) সাহেবের মতো, তারা ঘড়ি দেখে কাজ শুরু করেন এবং হাতের কাজ শেষ হতে না হতেই ঘড়ি দেখে কাজ ফেলে রেখে চলে যান। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী তাদের গুনে গুনে টাকা পরিশোধ করতে হয়। তারা আরো বলেন, জমি তৈরি, বীজ, সার, সেচ ও দিনমজুরের দাম বাড়লেও আমরা ফসলের সঠিক দাম পাই না। অনেক সময় আমাদের লোকসান গুণতে হয়। তাই চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে।