শরীফ মিয়া, মোমেন মিয়া, মোন্তাজ মোল্লা, ছালা, জামাই সেলিম, বাদল, দেলোয়ার ও পারভেজ। পেশায় রয়েছে ভিন্নতা। বয়সের তারতম্য থাকলেও এক অর্থে তারা বন্ধু। তবে সবার বাড়ি রাজধানীর খিলক্ষেতের পাতিরা দক্ষিণপাড়া তলনা ও আশপাশ এলাকায়।
আট জনই আসক্ত বাংলা মদে। আগে গাজীপুরের পূবাইল-কালীগঞ্জ এলাকা থেকে বাংলা মদ সংগ্রহ করত। নিজেরা খেত, বিক্রিও করত। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক তত্পরতার কারণে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। এ অবস্থায় আট বন্ধু মিলে বাংলা মদ তৈরি ও বাজারজাতের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু উপযুক্ত জায়গা কোথায়? শেষটায় তারা বেছে নেয় বালু-ইছামতী নদীর মোহনার নির্জন কাশবন। জনমানবহীন। সেখানে পৌঁছানোর একমাত্র বাহন নৌকা। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা বাংলা মদের কারখানা অবাধে চালাতে পারবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে তারা কাশবনে গড়ে তোলে বাংলা মদ তৈরির কারখানা। তৈরি করে একচালার ছাউনি। এখান থেকে বাংলা মদ তৈরি করে তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করত। অন্যদিকে মাদকসেবীদের নিয়ে নিয়ত মদের আড্ডা জমাত কাশবনে তৈরি ছাউনিতে। কাজটি এমনভাবে চলছিল, কারো পক্ষে কোনোভাবেই বোঝার উপায় ছিল না। কাশবনের গভীরে থরে থরে সাজানো প্লাস্টিকের নীল ড্রামে জমিয়ে রাখা হতো খেজুর ও আখের রস। কয়েক দিন রাখার পর তা জাল দিয়ে তৈরি করা হতো বাংলা মদ। আর মদ বিক্রি এবং মদের বাজারজাত করার জন্য খদ্দের সংগ্রহের কাজটি করা হতো কয়েকটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমনই তথ্য জানিয়েছে শরীফ মিয়া খুনের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আসামিরা। গত ৫ নভেম্বর খুন হয় শরীফ মিয়া। তাকে বালু নদে চুবিয়ে হত্যা করে তারই বন্ধুরা। ঘটনার দুই দিন পর ভাটারা থানার পুলিশ বালু নদ থেকে শরীফ মিয়ার ভাসমান মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরে মামলাটির তদন্ত ন্যস্ত হয় মহানগর গোয়েন্দা দপ্তরে (ডিবি)।
হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত মোমেন মিয়া ও মোন্তাজ মোল্লাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে গত বুধবার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।
মামলার তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশর উপকমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, ঢাকার উপকণ্ঠে এমন জনমানবহীন কাশবনে গড়ে ওঠা মাদক কারখানার অবস্থান কোনোভাবেই শনাক্ত করা সম্ভব ছিল না। খুনের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়েই আসামিদের দেওয়া তথ্যমতে এটি জানা যায়। গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাশবন থেকে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ বাংলা মদ এবং বাংলা মদ তৈরির সরঞ্জাম।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুনায়েদ আলম সরকার বলেন, প্রথমে মামলাটি ছিল ক্লুলেস। পরে বিভিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে নিহত শরীফের বন্ধুদের শনাক্ত করা হয়। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি ছয় জন জড়িত ছিল। এদের মধ্যে মোমেন মিয়া ও মোন্তাজ মোল্লাকে গত ২৪ নভেম্বর গ্রেফতার করা হয়। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পাশাপাশি সাক্ষী হিসেবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে ঘটনাস্থলে উপস্থিত নৌকার মাঝি পারভেজ। পলাতক অপর আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
জুনায়েদ আলম সরকার বলেন, শরীফ মিয়া পেশায় একজন ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাঝি। মাল টানে এবং বালু ও ইছামতী নদীতে যাত্রীও পারাপার করে। এর পাশাপাশি কাশবনে বন্ধুদের নিয়ে বাংলা মদের কারখানা চালাত। মাঝেমধ্যে কাশবনে তৈরি ছাউনিঘরে অপরাপর মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ইয়াবা ও বাংলা মদের আসর জমাত। এসব আসরে কখনো কখনো ভাড়া করে ভাসমান পতিতাদের নিয়ে আসা হতো। ঘটনার দিন গত ৫ নভেম্বর শরীফ মিয়া তার বন্ধু ছালা, জামাই সেলিম, মোন্তা, বাদলদের নিয়ে ২ হাজার টাকায় ভাড়া করে এক ভাসমান পতিতাকে। তারা ঐ কাশবনের ছাউনিতে না গিয়ে বালু নদে নৌকার মধ্যে চলে আড্ডা। অপর দিকে শরীফ মিয়ার অপর তিন বন্ধু মোমেন মিয়া, দেলোয়ার ও মোন্তাজ মোল্লা অপর একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে বাংলা মদ বিক্রির জন্য কোনো এক স্থানে যাচ্ছিল।
কিন্তু নৌকায় ভাসমান পতিতা নিয়ে আড্ডা জমানোর বিষয়টি আঁচ করতে পেরে শরীফ মিয়ার নৌকা অনুসরণ করে। শরীফ মিয়ার নৌকার কাছাকাছি আসতেই মোমেন ক্ষীপ্ত হয়। কারণ শরীফ মিয়ার নৌকায় যে মহিলা ছিল (ভাসমান পতিতা), সে ছিল মোমেন মিয়ার একধরনের প্রেমিকা। এ নিয়ে শরীফের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে মোমিন ও দোলোয়ার বাঁশ দিয়ে শরীফ মিয়ার মাথায় আঘাত করে। বাঁশের আঘাতে শরীফ মিয়া বালু নদে পড়ে যায়। পরে দুই নৌকায় যারা উপস্থিত ছিল, তারা সবাই শরীফ মিয়াকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে। এরপর তারা সবাই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
