মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার হইল চিকিত্সাসেবা। আমাদের দেশে এই চিকিত্সাসেবা সরকারি ও বেসরকারি এই দুই খাতে বিভক্ত। সরকারি খাতের চিকিত্সাসেবা অপ্রতুল হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ বেসরকারি খাতের সেবার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেই বেসরকারি চিকিত্সার ব্যাপারে হাজারো অভিযোগ পাওয়া যায়। দেশের বেসরকারি চিকিত্সাসেবা খাতে বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা প্রকট। এই খাতে গড়িয়া উঠিয়াছে কমিশনভিত্তিক বিপণনব্যবস্থা। তার উপরে এই অতি মুনাফালোভী বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সিংহভাগেরই নাই যথাযথ সরকারি অনুমোদন ও লাইসেন্স। তেমনি অবস্থা যশোরের অধিকাংশ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের। জেলার মোট ১৭০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে কেবল ১৩টির হালনাগাদ লাইসেন্স রহিয়াছে। বাকিগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হইতেছে অবৈধভাবে। এই সকল প্রতিষ্ঠানে সেবা প্রদানে মানা হইতেছে না সরকারি কোনো নীতিমালা। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গিয়াছে, যশোরে দীর্ঘদিন ধরিয়াই গড়িয়া উঠিয়াছে একের পর এক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। ২০১৭ সালের পর দুই বত্সরে গড়িয়া উঠিয়াছে এই ধরনের ৬০টি প্রতিষ্ঠান, যেইগুলির অধিকাংশের নাই লাইসেন্স। যেই ১৩টির হালনাগাদকৃত লাইসেন্স আছে, সেইগুলিও বেশির ভাগই সদরের। বাকি হাসপাতালগুলি জেলার শার্শা, কেশবপুর, অভয়নগর, মনিরামপুর, চৌগাছা ও ঝিকরগাছায় অবস্থিত। ফলে আমরা ধারণা করিতেছি, এক প্রকার প্রান্তিক মানুষই এই সকল হাসপাতালে চিকিত্সা লইয়া থাকে এবং তাহারাই অনিয়মের সর্বাধিক ভুক্তভোগী। এতগুলি লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল কী করিয়া তাহাদের কার্যক্রম চালাইতেছে, ইহা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হইবে; এইগুলি নজরদারি করিবার কি কেহ নাই?
জানা গিয়াছে, এই সকল হাসপাতাল রোগীদের নিকট হইতে ইচ্ছামতো ফিস আদায় করে। একই ধরনের পরীক্ষার জন্যে একেক হাসপাতাল একেক রকম ফিস আদায় করে। ফলে সেবা গ্রহণকারীদের বিভ্রান্তিতে পড়িতে হয়। সরকারি নির্দেশনা সত্ত্বেও এই সকল প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষানিরীক্ষার নির্ধারিত ফিসের তালিকা টাঙানো হয় নাই। সম্প্রতি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে স্বাস্থ্য বিভাগ কিন্তু তাহা পর্যাপ্ত নহে; লাইসেন্সবিহীন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ লইতে হইবে।
বেসরকারি হাসপাতালের মতো ব্যাবসায়িক বা ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত নিয়ন্ত্রণের পুরো দায়িত্ব সরকারের উপর অর্পিত থাকিলে তাহা সরকারের জন্য একটি বোঝাস্বরূপ হয় এবং ইহাতে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নির্ধারণ ও নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশেও এই খাতে পরীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ স্বাস্থ্যসেবা কমিশন গঠন করা উচিত বলিয়া মত দিয়াছেন অনেকে। পাশাপাশি চিকিত্সাসেবা যে একটি মৌলিক অধিকার, তাহা স্মরণ রাখিয়া সরকারি খাতের চিকিত্সাসেবা আরো বিস্তৃতকরণ ও মানোন্নয়নের দিকে নজর দিতে হইবে।
