এক ইতিহাস রচনা করল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে প্রায় ১০ হাজার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন রচিত হলো সেদিন। এই মিলনমেলায় প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে একেবারে সদ্য বের হয়ে আসা তরুণ-তরুণীরাও শামিল হয়। উত্সবকে ঘিরে গত সপ্তাহের শেষ দুই দিন অন্যরকম এক আনন্দ আর সুরধারা ভেসেছিল নগরীর আকাশে-বাতাসে।
দুই দিনব্যাপী এই জমকালো আয়োজনে আনন্দযজ্ঞের কিছুই কমতি ছিল না। অনুষ্ঠানসূচিতে ছিল চমকের পর চমক। চারুকলা প্রাঙ্গণ থেকে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে বিভিন্ন ব্যাচের র্যালি শুরু হয়। র্যালিতে লাল, সবুজ, হলুদ, কমলা, বেগুনি, আকাশি, নীলের বর্ণিল পোশাক; ব্যানার আর ফেস্টুনে যেন সাতরঙা রংধনুর আবির ছড়াচ্ছিল। গান, বাদ্য আর বাজনার তালে তালে প্রাক্তন আবালবৃদ্ধবনিতা এক কাতারে শামিল হয়ে নেচে-গেয়ে সিআরবির শিরীষতলায় গিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে যোগ দেয়। এরই মধ্যে অবিরাম চলে ফটো শুট, ফেসবুকে পোস্ট, লাইভ ভিডিও আর বিভিন্ন চ্যানেলগুলোতে নিজেদের আনন্দানুভূতির প্রকাশের হিড়িক। প্রথমদিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন উপাচার্য ড. শিরীণ আকতার। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আয়োজক কমিটির নেতৃবৃন্দ। বিভিন্ন ব্যাচের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশনায় শিরীষতলা পরিণত হয় প্রাণের এক উত্সবে। নাচ, গীত, ঢোলকের বাজনা আর বাঁশির মোহনীয় সুর এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে তরঙ্গ ছড়ায়। রকমারি আলোকসজ্জায় রাতের আকাশে তারারা ও ম্রিয়মাণ হয়। আতশবাজির লাল-নীল একরাশ রোশনাই ছড়িয়ে প্রাক্তনরা শেষ গানেরই রেশ নিয়ে বাড়ি ফেরে। পরের দিন সকাল ৯টা থেকে জিইসি কনভেনশন সেন্টার ছেয়ে যায় হাজার হাজার প্রাক্তনীর কলকাকলিতে। আবার পুরো মিলনায়তন জুড়ে ব্যাপ্তি ছড়াচ্চ্ছিল যেন এক খণ্ড চবি ক্যাম্পাস। কতভাবেই না সাজানো হয়েছিল। যে দিকে তাকাই, সেদিকে যেন রাশি রাশি সুন্দরের আরাধনা। সতীর্থরা মুগ্ধ! দীর্ঘদিনের পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে। ব্যাচে ব্যাচে ভিন্ন বর্ণিল পোশাক পরে শাটল ট্রেনে ছবি তুলছে, লোগো আর ব্যানার নিয়ে ছবিতে পোজ দিতে ব্যস্ত। কারো যেন সময় নেই। যার যার বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত ব্যাচ ব্যাচ। মঞ্চ প্যান্ডেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ আবার চেয়ার নিয়ে বসে গোল গোল করে রচনা করেছে অন্য রকম এক নন্দনকানন। সেখানে গলা ছেড়ে গান আর নাচ করে ফিরে পাবার প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে। চেনা বন্ধুদের কাছে পেয়ে সে কী আবেগ আর উচ্ছ্বাস! চট্টগ্রামের বাসিন্দারা অনেক বেশি আপ্লুত বাইরের বন্ধুদের পেয়ে। দেশের বাইরে ছাড়া ও ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা বন্ধুদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে পূর্ণ করে তোলে কানায় কানায়। প্রথম পর্বে চবির চার জন প্রাক্তন উপাচার্যকে সংবর্ধনা জানানো হয়। অনুষ্ঠানের চমক ছিল চবির সূচনাকালীন বর্ষের ছাত্র সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। দুপুরে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক মেজবানি খাবার দিয়ে ভূরিভোজ শেষে গল্প আর জম্পেশ আড্ডায় হেমন্তের সন্ধ্যায়, একটু একটু শীতের মিষ্টি আবহে প্রাক্তনীরা ফেটে পড়ে অনাবিল আনন্দ আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে। এদিকে মঞ্চে চলে সুরমূর্ছনা। ১৫তম ব্যাচের ছাত্রী দিনমণির গানের সঙ্গে নাচ করতে থাকে তারই সতীর্থ চিনু, আশীষ, রাশি, হেলেন আর ডেইজী। এরপর ১৯তম ব্যাচ যে উঠল মঞ্চে আর নামতেই চাইছে না। বিশাল এ দলটি একের পর এক গান গেয়ে দর্শক মাতায়। এর মধ্যে প্রাক্তন ছাত্র তথ্যমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবদুল করিম, আয়োজক কমিটির অন্যতম কর্ণধার ১৫তম ব্যাচের ছাত্র আলাউদ্দীন নাসিম, কামরুল হাসান হারুন, গিয়াস উদ্দীন প্রমুখ প্রাক্তনী অনুষ্ঠানে সর্বক্ষণ ছিলেন সরব ও প্রাণবন্ত। সাংস্কৃতিক কমিটির কর্মীরা সে কী তত্পর!
প্রাক্তন ছাত্র ইকবাল ভাই আর তার কন্যা প্রাক্তন ছাত্রী ও চারুকলার শিক্ষক আন্দালুসিয়া গান পরিবশেন করেন। আর আমন্ত্রিত শিল্পী অনুপমা মুক্তি, চট্টগ্রামের সন্তান বিশিষ্ট ব্যান্ড ব্যক্তিত্ব নকীব খান, সবশেষে চিরকূট গান পরিবেশন করে। অনুষ্ঠানের শেষ আয়োজন এবং মূল আকর্ষণ ছিল র্যাফেল ড্র। এটি পরিচালনা করেন আলাউদ্দিন নাসিম। তার প্রাণবন্ত ও সরস উপস্থাপনায় এই পর্বটি উপভোগ্য হয়ে ওঠে। ড্র শেষে ভাগ্যবানরা অনেক লোভনীয় পুরস্কার নিয়ে ঘরে ফেরে। রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় দুই দিনব্যাপী এই মিলনমেলার যবনিকাপাত হয়। এত রাতে দুদিনব্যাপী এই মেলা ভাঙলে ও কারো মুখে ছিল না কোনো ক্লান্তির ছাপ। সবার চোখে মুখে ছিল কি একটা প্রাপ্তির প্রশান্তি। এত বড়ো আয়োজন এত মানুষের উপস্থিতিতে ছিল চোখে পড়ার মতো শৃঙ্খলা। কোনো বিরক্তি, রাগারাগি, মান-অভিমানের ছিটেফোঁটাও না। কেবল আনন্দ, পরমানন্দ আর তৃপ্তি। বিদায়কালে যেন একে অপরকে বলছিল, ‘আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়।’
n লেখক :সাংবাদিক
