নিউজিল্যান্ড থেকে ডা. এড্রিক বেকার এসে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার কাইলাকুড়ি গ্রামের গরিব মানুষের চিকিত্সাসেবার দায়িত্ব নিয়ে গড়ে তোলেন কাইলাকুড়ি হাসপাতাল। প্রায় বত্রিশ বছর থেকে তিনি গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। সবার কাছে পরিচিত হয়েছিলেন ডাক্তার ভাই হিসেবে। গরিবের সেবায় আত্মোত্সর্গকৃত মানুষটি ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর দুরারোগ্য রোগে কাইলাকুড়ীতেই মারা যান।
মৃত্যুর আগে ডা. বেকার এদেশীয় ডাক্তারদের উদ্দেশে অনুরোধ করেছিলেন তার এই হাসপাতালটির দায়িত্ব নিতে; কিন্তু অজপাড়া গা আর গরিব মানুষের সংস্পর্শে যেন জাত যায় এদেশীয় ডাক্তারদের! তাই কোনো হূদয়বান বাংলাদেশি ডাক্তারের কানেই পৌঁছেনি ডাক্তার ভাইয়ের অনুরোধ; কিন্তু কানে পৌঁছে যায় সুদূর আমেরিকার ডা. জেসিন ও ডাক্তার মেরিন্ডি দম্পতির। ডাক্তার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে নিজেদের ছোট্ট চার বাচ্চাকে গুছিয়ে নিয়ে ২০১৮ সালে মধুপুরের কাইলাকুড়ী গ্রামে চলে আসেন তারা। দায়িত্ব নেন কাইলাকুড়ী হাসপাতালের। প্রথমেই এর নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন ডা. এড্রিক বেকারের নামে যিনি এই হাসপাতালের মাধ্যমেই সুদীর্ঘ বছর গ্রামের গরিব-অসহায় মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে গেছেন। কর্মী গুছিয়ে জেসিন-মেরিন্ডিদম্পতি আবার শুরু করেন গরিব মানুষের চিকিত্সার কাজ। গরিবের সেবা করাই তাদের কাছে আনন্দের। তাই তো সুদূর আমেরিকা থেকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে চলে এসেছেন এই দরিদ্র মানুষের দ্বারে। এই দম্পতির কাছে মানুষের সেবাই যেন সব।
একবার ভেবেছেন? এদেশীয় কোনো তরুণ চিকিত্সকও ডা. বেকারের গড়া গ্রামের হাসপাতালটিতে চিকিত্সা দিতে ইচ্ছুক নয়। গ্রামের পরিবেশে বড়ো হয়েও এদেশের ডাক্তারেরা যেন সেই গ্রামকেই ভুলে যান। গ্রামের মানুষের চিকিত্সায় আগ্রহ তাদের কদাচিত্। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম নিয়ম করেছিলেন যে, স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ডাক্তারের জন্য প্রথম দুই বছর নিজ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সাসেবা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এরপরও কি আপনি এলাকার হাসপাতালে রেজিস্টার্ড ডাক্তার খুঁজে পান? সপ্তাহে দুই-এক দিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে ঘণ্টা দুইয়েক সময় কাটিয়ে ফিরে যান তাদের প্রিয় গন্তব্য শহরে! সেখানে তারা উচ্চ ফিতে রোগী দেখেন, সময় দেন শহুরে রোগীদের। আর এদিকে বিনা চিকিত্সায় ভুগে মরেন আমাদের গ্রামের গরিব রোগীটি। কয়েক মাস আগে তো নড়াইলের এমপি মাশরাফি বিন মুর্তজাও তার এলাকার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারদের ডিউটিতে পাননি। সে নিয়েও তুমুল আলোচনা চলেছে তখন। তাতে কোনো লাভ হয়েছে? হয় নি।
মাশরাফি তবু তার এলাকার হাসপাতালের খোঁজটা নিয়েছেন। আমাদের বহু এমপিকেও তো খোঁজ নিতে গ্রামে যেতে দেখি না। তাহলে সেই অঞ্চলের রোগীদের কথা ভাবুন একবার। সরকারি বেতন নিয়েও ডাক্তাররা উপজেলা সদর হাসপাতালে রোগী দেখবেন না, তারা হ্যান্ডসাম ভিজিটে শহুরে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভুলে যান নিজের শেকড় গ্রাম আর গ্রামের মানুষকে। অর্থলিপ্সা অন্যপেশাজীবীদের মতো ডাক্তারদেরও অন্ধ করে দিয়েছে! অথচ ডাক্তারদেরই সবার আগে মানুষের আপন হওয়া দরকার ছিল। উপজেলার হাসপাতালে ডাক্তার ফেরাতে কোনো নিয়ম বা আইন বোধ হয় যথেষ্ট নয়, ডাক্তারদের বিবেকবোধ জাগ্রত হওয়াটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোটি গরিবের কথা ভেবে যদি এদেশের বেতনভুক্ত ডাক্তাররাও তাদের দায়িত্বটুকু যত্নের সঙ্গে পালন করত, তবুও গ্রামের অসহায় মানুষগুলো হাঁপ ছেড়ে বাঁচত।
আমেরিকান জেসিন-মেরিন্ডিদম্পতি যদি নিজের দেশ ছেড়ে আসতে পারেন, এড্রিন বেকার যদি নিউজিল্যান্ড ছেড়ে আসতে পারেন, তবে এদেশের চিকিত্সকরা নিজ এলাকাতেই থাকতে পারবে না কেন? তারা কি ডাক্তার ভাই না হয়ে ডাক্তার বাবু হতে চান? তাও দায়িত্ব ফাঁকি দিয়ে? তাহলে তো স্বাস্থ্যসেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সবার আগে দরকার নিজেদের বাবুগিরিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা। সেটি কি আমাদের ডাক্তারবাবুরা করতে চাইবেন?
লেখক : শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
